সদ্যপ্রয়াত বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্তের স্মরণে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিতে চলেছে নন্দন কর্তৃপক্ষ ও রাজ্য সরকার। জীবিতাবস্থায় যাঁর চলচ্চিত্রকে একটা দীর্ঘ সময় কলকাতার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রেক্ষাগৃহ ‘নন্দন’-এ ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল, মৃত্যুর পর সেই পরিচালকের সৃষ্টিকেই সম্মান জানাতে যৌথ উদ্যোগের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। মূলত দর্শক ও অনুরাগী মহলের দাবির প্রেক্ষিতেই প্রাক্তন এই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন পরিচালকের চলচ্চিত্র নিয়ে নন্দনে একটি বিশেষ প্রদর্শনী বা ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’-এর আয়োজন করা হচ্ছে।
গত শুক্রবার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে প্রয়াত পরিচালকের শেষকৃত্যের সময় রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল প্রথম এই প্রদর্শনীর কথা ঘোষণা করেন। শনিবার সেই বার্তাকেই আরও সবিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ।
রাজনৈতিক ‘অনাগ্রহ’ ও নন্দনে ব্রাত্য হওয়ার অতীত
জীবিতাবস্থায় স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত অনীক দত্তের একাধিক ছবি নন্দনে মুক্তি পায়নি। রাজনৈতিক মহলের মতে, তিনি বিদায়ী তৃণমূল সরকারের ‘পছন্দের মানুষ’ ছিলেন না। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (KIFF) তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ও কাট-আউট ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন অনীক দত্ত, তা-ও স্বয়ং নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে।
রুদ্রনীল ঘোষের দাবি, ওই প্রতিবাদের পর থেকেই তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়েন পরিচালক এবং তাঁর চলচ্চিত্র সরকারি প্রেক্ষাগৃহে ব্রাত্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পূর্বতন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নন্দন কর্তৃপক্ষকে সাথে নিয়ে এই বঞ্চনার অবসান ঘটাতে চাইছে।
‘রেট্রোস্পেক্টিভ’-এর মাধ্যমে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন
বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে জানান, অনীক বাবুর অনুরাগীদের আবেগ ও দাবিকে সম্মান জানিয়ে নন্দন কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্য সরকার যৌথভাবে তাঁর ছবিগুলি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই আয়োজনকে তিনি প্রথাগত ‘ফেস্টিভ্যাল’ বা উৎসব বলতে নারাজ। তাঁর মতে,
“অনীক বাবু অত্যন্ত স্পষ্টভাষী মানুষ ছিলেন। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর সেরা উপায় হলো তাঁর সেই সব সৃষ্টিকে দর্শকদের সামনে নিয়ে আসা, যা আগে দেখানো সম্ভব হয়নি। নন্দন কর্তৃপক্ষও আমাদের এই আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তবে দর্শক ও অনুরাগীরা যদি এই শ্রদ্ধার্ঘ্যকে ‘উৎসব’ হিসেবে দেখতে চান, তবে তা-ই হবে।”
মহাশ্মশানেই মিলেছিল সরকারি উদ্যোগের ইঙ্গিত
গত শুক্রবার প্রয়াত পরিচালকের প্রয়াণের পর কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শ্রদ্ধা জানাতে এসে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি সেখানেই স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, “অনীকদা আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। ওঁর ছবি নিয়ে আমরা নন্দনে বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করব।”
একই সুর শোনা গেছে বিজেপি শিবিরের অন্য তারকা প্রতিনিধিদের গলাতেও। নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে একই ঘোষণা করেন বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। অন্য দিকে, টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় প্রয়াত পরিচালককে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সময় বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ও রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন। রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে প্রয়াত পরিচালকের চলচ্চিত্রের এই ‘পুনর্বাসন’ টলিপাড়া তথা সংস্কৃতি মহলে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।

