হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে যুবকের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালি, বিরল শারীরিক গঠন ঘিরে চাঞ্চল্য

হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে যুবকের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালি, বিরল শারীরিক গঠন ঘিরে চাঞ্চল্য

হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে এক যুবকের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির সন্ধান পেলেন চিকিৎসকেরা। ডায়মন্ড হারবার স্বাস্থ্যজেলার একটি নার্সিংহোমে এই বিরল ঘটনা সামনে এসেছে। ২৪ বছর বয়সি ওই যুবক বজবজের বাসিন্দা। পুরুষ হিসেবেই তিনি নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর দেহে মহিলাদের প্রজননতন্ত্রের অংশবিশেষ দেখতে পান চিকিৎসকেরা। ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বিরল থেকে বিরলতম বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞেরা। যুবকের শারীরিক গঠন ও ক্রোমোজ়োমের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা করার কথা ভাবছেন চিকিৎসকেরা।

গত সোমবার হার্নিয়ার চিকিৎসার জন্য ডায়মন্ড হারবার এলাকার ওই নার্সিংহোমে ভর্তি হন যুবক। পরের দিন তাঁর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার অস্ত্রোপচার করতে গিয়েই জরায়ু ও ডিম্বনালির উপস্থিতি লক্ষ করেন চিকিৎসকেরা। সাধারণত মহিলাদের প্রজননতন্ত্রে ডিম্বনালি ডিম্বাশয় থেকে নির্গত ডিম্বাণুকে জরায়ুর দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যুবক ভর্তি হয়েছিলেন, সেই এইচ জামান বলেন, ‘‘পুরুষ হিসেবেই উনি আমার এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। অপারেশন করার সময় দেখি, যুবকের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালিও রয়েছে। এটার জন্য আমরা সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। কারণ, শুরু থেকে এই রোগীকে আমরা পুরুষ হিসেবেই জেনে এসেছি।’’

এই পরিস্থিতিতে যুবকের জিনগত ও প্রজননগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ‘ক্রোমোজ়োম স্টাডি’ বা ক্রোমোজ়োম বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করছেন চিকিৎসকেরা। এসএসকেএম ও এনআরএস-সহ একাধিক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদেরও বক্তব্য, পরীক্ষার মাধ্যমেই এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

কী কারণে হতে পারে এমন শারীরিক গঠন?

চিকিৎসকদের বক্তব্য, এ ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের নজির বিশ্বজুড়েই অত্যন্ত বিরল। সাধারণ জনসংখ্যার মধ্যে কত জনের এমন শারীরিক গঠন রয়েছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও সহজলভ্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঘটনাচক্রে বিষয়টি সামনে আসে।

এসএসকেএমের ইউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক সৌভিক চট্টোপাধ্যায় জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগে এ ধরনের কিছু অবস্থাকে ‘সিউডোহেরম্যাফ্রোডিটিজ়ম’ বলা হত। বর্তমানে বিষয়টিকে আরও বিস্তৃতভাবে ‘ডিফারেন্সেস অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট’ (ডিএসডি) বা যৌনবিকাশের ভিন্নতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তাঁর ব্যাখ্যা, কিছু বিরল ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তির বহিরঙ্গের যৌন বৈশিষ্ট্য, ক্রোমোজ়োম, হরমোন এবং অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গের গঠনের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। হরমোনের অস্বাভাবিকতা এবং ভ্রূণের বিকাশের সময় অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবের তারতম্যও এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

সৌভিকের কথায়, ‘‘বহিরঙ্গে পুরুষের মতো বৈশিষ্ট্য থাকলেই কোনও ব্যক্তি জিনগতভাবে পুরুষ বা তাঁর প্রজনন ক্ষমতা পুরুষের মতো, তা কিন্তু নয়। ক্রোমোজ়োম, হরমোন, অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ এবং বহির্গত যৌনাঙ্গের গঠনের উপর পুরো বিষয়টি নির্ভর করে।’’

চিকিৎসকদের মতে, অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবে কিছু ক্ষেত্রে ক্লিটোরিস স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে পুরুষাঙ্গের মতো দেখতে হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রজনন অঙ্গের গঠন এবং অণ্ডকোষের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। ডায়মন্ড হারবারের ওই যুবকের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ ছিল না বলে জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকেরা।

‘পারসিসট্যান্ট ম্যুলেরিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম’-এর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার পরামর্শ

পুরুষের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির উপস্থিতির সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন সেবা সদনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ তথা স্ত্রীরোগ চিকিৎসক আশিস মুখোপাধ্যায় ‘পারসিসট্যান্ট ম্যুলেরিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম’ (পিএমডিএস)-এর কথা উল্লেখ করেছেন।

এই বিরল অবস্থায় পুরুষের দেহে জরায়ু ও ডিম্বনালির মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ থেকে যেতে পারে। আশিসের ব্যাখ্যা, সাধারণত পুরুষ ভ্রূণের অণ্ডকোষ থেকে ‘মুলেরিয়ান ইনহিবিটিং ফ্যাক্টর’ (এমআইএফ) নিঃসৃত হয়। এই উপাদান ভ্রূণের বিকাশের সময় মুলেরিয়ান নালির স্বাভাবিক বিকাশ রোধ করে। সেই প্রক্রিয়ায় কোনও সমস্যা হলে ওই নালি থেকে জরায়ু ও ডিম্বনালির মতো অঙ্গ থেকে যেতে পারে।

তবে ডায়মন্ড হারবারের যুবকের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য ক্রোমোজ়োম বিশ্লেষণ-সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

১৮ বছর আগেও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে মিলেছিল একই ধরনের ঘটনা

এ ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান উৎপল দে। প্রায় ১৮ বছর আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত অবস্থায় এক রোগীর হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে ডিম্বনালির সন্ধান পেয়েছিলেন তাঁরা।

উৎপল বলেন, এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় প্রথমেই তাঁর নিজের পরিচয় ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি এত দিন নিজেকে যে পরিচয়ে জেনে এসেছেন, চিকিৎসার সময় সেই পরিচয়কে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়। তাই প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি কাউন্সেলিংও জরুরি।

তাঁর মতে, রোগীর ইচ্ছা ও সম্মতিকে মর্যাদা দিয়ে পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্য নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডায়মন্ড হারবারের এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, মানুষের যৌনবিকাশ ও প্রজননতন্ত্রের গঠন সব ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। তবে ওই যুবকের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে জরায়ু ও ডিম্বনালি তৈরি হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.