লোকসভাতেও বড় ধাক্কা তৃণমূলের: মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী শিবিরে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

লোকসভাতেও বড় ধাক্কা তৃণমূলের: মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী শিবিরে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভার পরিষদীয় দল হাতছাড়া হওয়ার পর এবার লোকসভাতেও চরম ভাঙনের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। এবার মমতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী তথা লোকসভায় তৃণমূলের প্রবীণতম সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিলেন বিদ্রোহী শিবিরে।

শনিবার দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে দফায় দফায় বৈঠকের পর এই প্রবীণ নেতার শিবির বদলের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এর ফলে লোকসভায় তৃণমূলের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিমানবন্দরে শতাব্দীর সাথে উপস্থিতি ও শাহ-ভূপেন্দ্রর সাথে বৈঠক

শনিবার সকালে কলকাতা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কাকতালীয়ভাবে, একই বিমানে দিল্লি যান বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ তথা বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। দিল্লিতে নামার পর বিমানবন্দর থেকে দুজনকে একই গাড়িতে চড়ে বের হতে দেখা যায়।

তাঁদের গন্তব্য ছিল বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবন, যা গত কয়েকদিন ধরে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের মূল বৈঠকস্থল হয়ে উঠেছে। সেখানে দুপুর নাগাদ একপ্রস্থ বৈঠকের পর সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

সোমবার স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি: নতুন সমীকরণ

লোকসভায় তৃণমূলের প্রাক্তন দলনেতা সুদীপের এই পদক্ষেপে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। তাঁর দীর্ঘ সংসদীয় ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে বিদ্রোহীরা কীভাবে কাজে লাগায় এবং এর ফলে কাকলি-শতাব্দীদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

সূত্র মারফত জানা গেছে, লোকসভার সংসদীয় দলে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে আগামী সোমবার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিতে পারেন বিদ্রোহী সাংসদেরা। তার আগে আরও এক দফা বৈঠকে বসতে পারেন তাঁরা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ভাঙন

গত সোমবার তৃণমূলের সংসদীয় দলে প্রথম ভাঙন প্রকাশ্যে আসে। বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে দাবি করা হয় যে, দলের প্রায় ২০ জন সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে রয়েছেন এবং তাঁরা কেন্দ্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এনডিএ (NDA)-কে সমর্থন দিতে চান।

তৎকালীন সময়ে দিল্লিতে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র (INDIA) বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন, তখনই লোকসভায় এই ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

পরবর্তীতে গত শুক্রবার ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি নথি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে প্রথম সইটি ছিল কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এবং দ্বিতীয়টি শতাব্দী রায়ের। ওই নথিতে স্বাক্ষরকারী অন্য সাংসদেরা হলেন:

বাপি হালদার, শর্মিলা সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ বর্মা বসুনিয়া, অসিত মাল, অরূপ চক্রবর্তী, কালীপদ সরেন, দেব, জুন মালিয়া, পার্থ ভৌমিক, খলিলুর রহমান, আবু তাহের খান, ইউসুফ পাঠান, মিতালি বাগ এবং মালা রায়।

বিদ্রোহী শিবিরের সূত্র অনুযায়ী, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সায়নী ঘোষ পরে ওই নথিতে সই করেন। নথিতে যে ৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর ছিল না, তাঁরা হলেন— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, শত্রুঘ্ন সিংহ, প্রতিমা মণ্ডল, সাজদা আহমেদ এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে শনিবার সুদীপ নিজেই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ায় সমীকরণ বদলে গেল।

কলকাতায় কুণাল ঘোষের হাতে দায়িত্ব ও সুদীপকে কটাক্ষ

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলবদলের খবর আসতেই কলকাতায় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেয় তৃণমূল নেতৃত্ব। উত্তর কলকাতায় তৃণমূলের জেলা সভাপতি পদ থেকে সুদীপকে অপসারণ করে সেই দায়িত্বে আনা হয়েছে কুণাল ঘোষকে। উল্লেখ্য, উত্তর কলকাতার রাজনীতিতে সুদীপ ও কুণালের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব সর্বজনবিদিত।

দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই সুদীপকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন কুণাল ঘোষ। বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক তথা নতুন জেলা সভাপতি বলেন:

“আমাদের অনেকের আপত্তি না শুনেও তিনি (মমতা) আস্থা রেখেছিলেন, পদ দিয়েছিলেন। যে ভাবে তিনি (সুদীপ) গিয়েছেন, যে বার্তাটা যাচ্ছে, তা খুবই খারাপ বার্তা।”

তৃণমূলের অন্দরে চলা এই তীব্র ডামাডোল এবং একের পর এক শীর্ষ নেতার দলত্যাগ দলটির ভবিষ্যৎ ও সংসদীয় ক্ষমতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.