মার্ক্সবাদের প্রয়োগের ভয়াবহতার প্রমাণ ‘গুলাগ’ এবং দুই সাহসী কন্ঠস্বর

মার্ক্সবাদের প্রয়োগের ভয়াবহতার প্রমাণ ‘গুলাগ’ এবং দুই সাহসী কন্ঠস্বর

সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে একটি অন্যতম অন্ধকার এবং যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় হলো ‘গুলাগ’। এটি ছিল একটি বিস্তৃত শ্রমশিবিরের জাল, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, বুদ্ধিজীবী, এবং সাধারণ মানুষকে অমানবিক পরিস্থিতিতে দাস শ্রমে বাধ্য করা হতো। গুলাগের বিভীষিকা এবং এই নরকযন্ত্রণা থেকে ফিরে এসে বিশ্বকে সত্য জানানো দুই সাহসী ব্যক্তি – চিত্রশিল্পী দানজিগ বালদায়েভ এবং লেখক ভারলাম শালামভ মার্ক্সবাদের প্রয়োগের ভয়াবহতার প্রমাণ রেখে গেছেন।
দানজিগ বালদায়েভ গুলাগের রেখাচিত্রের মাধ্যমে মার্ক্সবাদের অমানবিক রূপ কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন।
দানজিগ বালদায়েভ পেশায় একজন সোভিয়েত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু গুলাগের শ্রমশিবিরগুলোতে ‘গার্ড’ বা রক্ষী হিসেবে কাজ করার সুবাদে তিনি কয়েদিদের ওপর চালানো নির্মম অত্যাচার, অনাহার এবং হত্যার বীভৎস দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ পান। বালদায়েভ বিশ্বাস করতেন যে, এই পাশবিকতা যদি ছবির মাধ্যমে ধরে রাখা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই বিশ্বাস করবে না যে কোলিমার মতো বরফশীতল জায়গায় মানুষ মানুষের ওপর কতটা অমানবিক হতে পারে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বালদায়েভ গোপনে শত শত স্কেচ এবং অঙ্কন তৈরি করেন, যা সোভিয়েত আমলের চরম দমন-পীড়নের এক জীবন্ত চাক্ষুষ দলিল হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর এই চিত্রকর্মগুলো কেবল শিল্প নয়, বরং ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়ের এমন এক অকাট্য প্রমাণ যা কোনো শব্দ বা বক্তৃতা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। বালদায়েভ নিজেই বলেছিলেন, “কেউ কেউ হয়তো বলবেন যে ‘গুলাগ’ ইতিহাসের একটি বিস্মৃত অধ্যায় এবং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি নিজে অত্যন্ত ভয়াবহ সব অপরাধের সাক্ষী হয়ে আছি। এই অপরাধগুলো নিয়ে কথা বলা এবং সেগুলোকে প্রকাশ্যে আনা এখনো দেরি হয়ে যায়নি।”
ভারলাম শালামভ শব্দের মাধ্যমে গুলাগের বিভীষিকার প্রমাণ রেখে গেছেন।
ভারলাম শালামভ ছিলেন একজন প্রখ্যাত রুশ লেখক, কবি এবং সাংবাদিক। তিনি নিজের জীবনের দীর্ঘ সময় নরকতুল্য গুলাগে কাটিয়েছেন। শালামভ ১৯৩৭ সালে ‘প্রতিবিপ্লবী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে কোলিমার শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়েছিল। প্রচণ্ড শীত, অনাহার এবং অমানুষিক খাটুনির মধ্যে তিনি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।
গুলাগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শালামভ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘কোলিমা টেলস’ (Kolyma Tales) নামক ছোটগল্পের সংকলনটি লেখেন। এতে তিনি কোনো অলঙ্কার ছাড়াই অত্যন্ত নির্মোহ এবং নিষ্ঠুর ভাষায় বর্ণনা করেছেন যে, কীভাবে চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের মানবিক গুণাবলি ধুলোয় মিশে যায় এবং মানুষ কেবল টিকে থাকার যন্ত্রে পরিণত হয়। শালামভ মনে করতেন গুলাগের অভিজ্ঞতা সাধারণ কোনো ফিকশন বা গল্প নয়; এটি ছিল মানুষের নৈতিক পরাজয়ের এক চরম বাস্তবতা। তাঁর একটি উদ্ধৃতি গুলাগের ভয়াবহতা এবং মানবিকতার চরম পতনের বর্ণনা দেয়: “মানুষের সমস্ত আবেগ—ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, ঈর্ষা, সহমর্মিতা, করুণা, যশের আকাঙ্ক্ষা, সততা—সবই আমাদের শরীর থেকে ঝরে যাওয়া মাংসের সাথে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল…।”
উপসংহার
গুলাগের ইতিহাস সোভিয়েত ইউনিয়নের দমন-পীড়ন এবং মানবিকতার চরম পরাজয়ের এক লজ্জাজনক অধ্যায়। এই ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মনে রাখা এবং এর ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। দানজিগ বালদায়েভ এবং ভারলাম শালামভ তাঁদের শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমে গুলাগের বিভীষিকা বিশ্ববাসীকে জানাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যকে কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়।

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.