সৌরভ আর জ়েড ক্যাটেগরি নন! রাজ্যে পালাবদলের পরেই প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের নিরাপত্তার বহর কমাল বিজেপি সরকার

সৌরভ আর জ়েড ক্যাটেগরি নন! রাজ্যে পালাবদলের পরেই প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের নিরাপত্তার বহর কমাল বিজেপি সরকার

ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক তথা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল (CAB)-এর সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড়সড় কাটছাঁট করল রাজ্য সরকার। গত তিন বছর ধরে সর্বোচ্চ স্তরের ‘জেড ক্যাটেগরি’ (Z Category)-র নিরাপত্তা পেয়ে আসা প্রাক্তন এই বিসিসিআই প্রধানের নিরাপত্তা এক ধাক্কায় দু’ধাপ নামিয়ে ‘ওয়াই ক্যাটেগরি’ (Y Category) করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা হ্রাসের এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাধারণত প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, বিচারপতি, সাংসদ ও বিশিষ্টজনদের জীবনের ঝুঁকি পর্যালোচনা করে ‘এক্স’, ‘ওয়াই’ ও ‘জেড’ ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত সৌরভ ‘ওয়াই ক্যাটেগরি’র নিরাপত্তাই পেতেন, যেখানে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের ৩ জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী (যার মধ্যে ২ জন সশস্ত্র) এবং তাঁর বেহালার বাড়িতে কয়েকজন পুলিশকর্মী মোতায়েন থাকতেন। পরবর্তীতে তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তাঁর নিরাপত্তা বাড়িয়ে ‘জেড ক্যাটেগরি’ করে। এর ফলে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা বেড়ে ৮-১০ জন হয় এবং রাস্তায় যাতায়াতের জন্য পুলিশের পাইলট কারও বরাদ্দ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশকর্মী তাঁর সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। নতুন সরকারি নির্দেশে সেই বাড়তি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো।

রাজনৈতিক পালাবদল ও ভিআইপি নিরাপত্তা পর্যালোচনা

রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতেই বিভিন্ন স্তরের ভিআইপি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি বা প্রয়োজন না থাকলে কাউকে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হবে না।

গত ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যে এই নিরাপত্তা ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পূর্বতন তৃণমূল জমানায় সর্বোচ্চ ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তা পেতেন রাজ্যপাল, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন সরকারের নির্দেশিকায় ইতিপূর্বেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ি এবং অভিষেকের আবাসন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট জানানো হয়েছে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাধারণ সাংসদ হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইন মোতাবেক যতটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী, ঠিক ততটুকুই পাবেন। এর পর একে একে বহু তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন পুলিশ কর্তাদের নিরাপত্তা কমানোর পর, এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম।

নেপথ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘ভারসাম্যের রাজনীতি’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা হ্রাসের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) সঙ্গে তাঁর বিগত কয়েক বছরের সম্পর্কের ওঠানামা ও রাজনৈতিক সমীকরণ জড়িয়ে রয়েছে।

সময়কালরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও সমীকরণ
২০১৯ – ২০২১২০১৯ সালে অমিত শাহের বিশেষ ভূমিকায় সৌরভ বিসিসিআই সভাপতি হন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সৌরভকে মুখ করতে চেয়েছিল বিজেপি। অমিত শাহ তাঁর বেহালার বাড়িতে নৈশভোজেও যান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সৌরভ রাজনীতি থেকে দূরে থাকায় বিজেপি একে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে দেখেছিল।
২০২৩সম্পর্কের বরফ গলাতে ২০২৩ সালে সৌরভকে ত্রিপুরার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা হয় এবং ইডেনে বিশ্বকাপের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দেওয়া হয়। তবে সৌরভ বরাবরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ—উভয় পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্য রক্ষার নীতি নিয়ে চলেন।
সেপ্টেম্বর ২০২৩মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পেন সফরে সঙ্গী হন সৌরভ এবং মাদ্রিদের বাণিজ্য মঞ্চ থেকে শালবনিতে ইস্পাত কারখানা গড়ার ঘোষণা করেন।

সম্প্রতি শালবনি কারখানা প্রসঙ্গে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সৌরভকে উদ্দেশ্য করে তীব্র কটাক্ষ করেছিলেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বর্তমান শাসক দল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের এই ‘ভারসাম্যের রাজনীতি’ বা রাজনৈতিক অবস্থানকে ঠিক কীভাবে দেখছে, শমীক ভট্টাচার্যের সেই মন্তব্যের মধ্যেই তার ইঙ্গিত ছিল। আর এবার নিরাপত্তা এক ধাক্কায় ‘জেড’ থেকে ‘ওয়াই’ ক্যাটেগরিতে নামিয়ে এনে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার সেই প্রচ্ছন্ন বার্তাটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.