রাজ্যে ফের পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটল। বারুইপুরের পর এ বার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায়। পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি অভিযুক্ত গুলিও চালান। আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পাল্টা গুলিতে নিহত হন প্রহ্লাদ দাস। তাঁর বাঁ পায়ে এবং বুকে মোট তিনটি গুলি লাগে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন রাজনৈতিক মহলে তপ্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তেমনই নিহত কিশোরী ও অভিযুক্ত—উভয় পরিবারের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
গত রবিবার গাইঘাটা থানা এলাকার এক ১৭ বছর বয়সি কিশোরীর বিবস্ত্র ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার হয় স্থানীয় এক প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন দিক থেকে। পরিবারের অভিযোগ ছিল, ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ রবিবারই মৃতার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ও পূর্বপরিচিত প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের বিবরণ
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত ১২টার কিছু আগে অভিযুক্ত প্রহ্লাদকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ দল। সেখান থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পুনর্নির্মাণ পর্ব শেষে ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে প্রস্রাব করার নাম করে গাড়ি থামানোর অনুরোধ করেন অভিযুক্ত। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নেন এবং পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালান। এর মধ্যে একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে।
আকস্মিক এই হামলায় এক পুলিশকর্মী জখম হন এবং অপর এক পুলিশকর্মী প্রাণ বাঁচাতে রাস্তার ধারের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর আত্মরক্ষার্থে পুলিশও চার রাউন্ড পাল্টা গুলি চালায়। গুলিতে অভিযুক্ত প্রহ্লাদের বাঁ পায়ে ও বুকে আঘাত লাগে। দ্রুত তাঁকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
নিহত কিশোরীর পরিবারের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর নিহত কিশোরীর পরিবার পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে। মৃতার বাবা ও মা জানান, অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা ও গুলি চালিয়েছিল, তাই পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ করেছে। তাঁরা একে ন্যায়বিচার বলে উল্লেখ করে প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
অভিযুক্তের পরিবার ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য
চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালের বাইরে মৃত ছেলের দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিযুক্তের মা। তিনি জানান, ছেলের কঠোর শাস্তি তিনি চেয়েছিলেন কিন্তু এমন এনকাউন্টার চাননি। তবে নাগরিক হিসেবে এই বিচারকে তিনি সমর্থন করছেন এবং অন্য কেউ যেন এমন ঘৃণ্য অপরাধ করার সাহস না পায়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন। অভিযুক্তের বাবাও এই পরিণতিকে সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্তের ভাই ধ্রুব দাস জানান, তাঁর দাদা ও ওই কিশোরীর মধ্যে পূর্বপরিচয় ও যাতায়াত ছিল। তবে দাদা এমন অপরাধ করতে পারেন এবং পুলিশের ওপর গুলি চালিয়ে পালাতে পারেন, তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর রাজ্য রাজনীতিতেও সুর চড়েছে। শাসক ও বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন নেতানেত্রী এই এনকাউন্টারকে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন। মন্ত্রীদের একাংশের বক্তব্য, আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে অপরাধের বিরুদ্ধে এই জিরো টলারেন্স নীতি অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, এই ধরনের বিচার প্রক্রিয়া ও তথাকথিত এনকাউন্টার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

