গয়া মাহাত্ম্য

বনবাসকালে চিত্রকূট পর্বতের উপর রাম, সীতা, লক্ষ্মণ বাস করছেন। রাজা দশরথের মৃত্যুর বছর পূর্ণ হয়েছে। পিতৃশ্রাদ্ধ করতে হবে। শ্রীরামচন্দ্র খুবই চিন্তায় আছেন— কীভাবে পিতৃ-সংবৎসর শ্রাদ্ধ করবেন। হঠাৎ শ্রীরামচন্দ্রের খেয়াল হলো তার আঙুলে শেষ সম্বল একটি মাণিক্য-অঙ্গুরী রয়েছে। দুই ভাই ওই মাণিক্য-অঙ্গুরির বিনিময়ে পিতৃ-সংবৎসর শ্রাদ্ধের সামগ্রী আনতে গেলেন।

ফল্গুনদী-তীরে বসে সীতা বালি নিয়ে খেলা করে চলেছেন। তাঁর সেই খেলা আসলে জগৎসংসারের প্রণম্যলীলা। তিনি একমনে স্মরণ করে চলেছেন তার শ্বশুরঠাকুর রাজা দশরথকে। এমন সময় রাজা দশরথ আবির্ভূত হয়ে বধূমাতা সীতাকে সস্নেহে সংবৎসর শ্রাদ্ধ করতে বললেন। দশরথ সীতাকে জানালেন, তিনি বিলম্ব করতে আর পারছেন না। তিনি সীতার কাছে বালির পিণ্ড প্রার্থনা করলেন এবং জানালেন তাঁর কাছে সীতা রামেরই সমান। তাই পুত্র রামের অনুপস্থিতিতে সীতা তাঁকে পিণ্ডদান করতে পারে। রামের বিশ্বাসের অবগতির জন্য তিনি সীতাকে পিণ্ডদান ক্রিয়ার কিছু সাক্ষী রেখে অনুষ্ঠান সমাপন করতে বললেন। সীতা তখন ব্রাহ্মণ, তুলসী, ফল্গুনদী এবং বটবৃক্ষকে সাক্ষী রেখে ফল্গুনদীর বালি পিণ্ড হিসাবে দশরথকে দান করলেন। দশরথ তা সানন্দে গ্রহণ করে, তৃপ্ত হয়ে, সীতাকে আশিস জানিয়ে স্বর্গপথে গমন করলেন।

রাম-লক্ষ্মণ দুই ভাই পিতৃ-সংবৎসর শ্রাদ্ধের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ফল্গুনদীর তীরে এলেন। সীতা খুশিমনে দশরথের পিণ্ডগ্রহণার্থে আগমন এবং পিণ্ড গ্রহণ সমাপণান্তে স্বর্গপথে গমনের কথা দুজনকে জানালেন। তারা দুজনেই বিস্মিত হয়ে সীতার মুখের দিকে তাকালেন। সীতা তখন সাক্ষী স্বরূপ ব্রাহ্মণ, তুলসী, ফল্গুনদী এবং বটবৃক্ষে শরণাপন্ন হলেন। ব্রাহ্মণ, তুলসী, ফল্গুনদী সীতার বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষী দিলেন। রামের পক্ষে থাকার জন্য তারা তিনজনে দশরথের আগমন অস্বীকার করলেন। সীতা লজ্জায়, দুঃখে, রাগে ব্রাহ্মণকে অভিশাপ দিলেন প্রচুর সম্পত্তি থাকলেও ব্রাহ্মণকে ভিক্ষা গ্রহণের জন্য দেশ-দেশান্তরে যেতে হবে। তুলসীকে বললেন— তার পাতা শ্রীহরির আদরের ধন হবে, কিন্তু চিরকাল সে অপবিত্রস্থানে আভূমি হয়ে জন্মাবে এবং শিয়াল-কুকুর তার গায়ে প্রস্রাব ত্যাগ করবে। ফল্গুনদীকে সীতা চিরকাল অন্তঃসলিলা হয়ে থাকার অভিশাপ দিয়ে বললেন তার শরীরের ওপর দিয়ে শিয়াল-কুকুর ডিঙিয়ে যাবে। বটবৃক্ষের কাছে রাম-লক্ষ্মণকে নিয়ে সঠিক সাক্ষ্যের জন্য সীতামাতা উপস্থিত হলে বটবৃক্ষ প্রথমে রাম-সীতার যুগলমূর্তি দর্শন করতে চাইলেন। রামের বামদিকে সীতা খুশিমনে দাঁড়ালেন। বটবৃক্ষ প্রণামরত অবস্থায় শ্রীরামচন্দ্রকে সত্য কথাই বললেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানালেন। শ্রীরামচন্দ্র সবকথা শুনে প্রসন্ন হয়ে বটবৃক্ষকে চিরজীবী, অক্ষয় অমর হয়ে থাকার আশীর্বাদ দিলেন। জানালেন সীতামাতা বটবৃক্ষকে বর দিয়ে বললেন, বটবৃক্ষ শীতকালে উষ্ণ এবং গ্রীষ্মে শীতল হবে। তার ডালে-ডালে পল্লব বিস্তার করবে, মনোহর সুশীতল বটবৃক্ষ সর্বদাই আনন্দে থাকবে।

চিত্রকূট পর্বত ছেড়ে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ গয়াধামে গেলেন। সীতামাতা প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের কাছে গয়া মাহাত্ম্য শুনতে চাইলেন। রামচন্দ্র সীতাকে বললেন গয়াধামে পিণ্ডদান করলে পিণ্ড গ্রহীতা বৈকুণ্ঠে স্থান পায়। সীতামাতা জগৎসংসারকে নিয়ে সেই কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন।

বহুকাল পূর্বে গয়াসুর নামে এক বিশালাকায় এবং মহাশক্তিধর দৈত্য ছিলেন। ইন্দ্রাদি দেবতা গয়াসুরের পরাক্রমের কাছে আপারগ হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তারা গয়াসুরের শরীরের ওপর বসে যজ্ঞ করতে চাইলেন। গয়াসুর চিৎ হয়ে শুলে ব্রহ্মা ও শিব পৃথিবীর সমস্ত পাহাড় পর্বত গাছপালা গয়াসুরের দেহের সম্মুখভাগে স্থাপন করে ইন্দ্র-সহ দেবতাদের নিয়ে যজ্ঞ শুরু করলেন। যজ্ঞ শুরু হতেই ঘৃতের স্পর্শে অগ্নি মূর্তিমান হয়ে উঠলেন। সবাই ভাবলেন গয়াসুর বোধ হয় মারা গেছেন। যজ্ঞ শেষে সবাই যখন যজ্ঞের ফোঁটা কপালে পরছেন, তখন গয়াসুর গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। গয়াসুর বললেন, হে দেবগণ! আপনারা আমার মৃত্যু নিয়ে খুব চিন্তিত, কিন্তু আপনাদের সবিনয়ে আমি জানাচ্ছি যে, আপনাদের কারুর হাতে আমার মৃত্যু হবে না।

এরপর নারায়ণ এলেন, গয়াসুরকে সম্মান প্রদর্শন করে নারায়ণ তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করলেন, নারায়ণ গয়াসুরের পরাক্রমে তুষ্ট হয়ে যথোচিত মর্যাদা দিয়ে, ক্ষমতা প্রদর্শনের নির্দিষ্ট সীমা স্মরণ করিয়ে তাকে পরাজয় বরণ করালেন এবং যথাযথভাবে চিরন্তন সম্মান প্রদর্শন করে। গয়াসুরের মস্তকে তার পাদপদ্ম স্থাপন করলেন।

বিষ্ণুপদে গয়াশিরে যে কেউ পিণ্ডদান করলে পিণ্ডদাতার মোক্ষধামে যাওয়ার পথ সুগম হয়ে থাকে।

অমিত ঘোষ দস্তিদার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.