রাজ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র দেড় মাসের মাথায় কলকাতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম পরিবর্তন করল কলকাতা পুরসভা। পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট ক্রসিং থেকে ডন বস্কো সার্কেল পর্যন্ত বিস্তৃত ৫০০ মিটারের ‘সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ’ রাস্তাটি এখন থেকে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ নামে পরিচিত হবে। গত ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উপলক্ষে এই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন:
“পশ্চিমবঙ্গ দিবসের পবিত্র লগ্নে কলকাতা পুরসভা যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি তার ভূয়সী প্রশংসা করছি। অতীতে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক অবিচার সংশোধনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন গোপাল মুখোপাধ্যায় (যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামেও পরিচিত)। তাঁর নামে এই নামকরণ পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত নায়ককে সম্মান জানানোর শামিল। মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায়ও।
সুরাবর্দি বিতর্ক: কার নামে ছিল এই রাস্তা?
রাস্তার নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই ‘সুরাবর্দি’ আসলে কে, তা নিয়ে প্রধানত তিনটি মত উঠে এসেছে:
১. লিগ নেতা হুসেন শহিদ সুরাবর্দি (জনমানসের ধারণা)
সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে ‘সুরাবর্দি’ নামটি ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার মূল হোতা তথা মুসলিম লিগ নেতা ও অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হুসেন শহিদ সুরাবর্দির সঙ্গেই যুক্ত। আরএসএস-এর শিক্ষা সংগঠন ‘ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল’-এর দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের সদস্য অধ্যাপক অরিন্দম ভট্টাচার্য বলেন, “সুরাবর্দি শব্দটা শুনলেই দাঙ্গার কুখ্যাত ক্ষত মনে পড়ে। এই নাম বদলকে আমরা সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি।”
২. শিক্ষাবিদ হাসান সুরাবর্দি (ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি)
কলকাতা পুরসভার ইতিহাস চর্চাকারী গৌতম বসুমল্লিক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অমিত দে-র মতে, এই রাস্তা হুসেন সুরাবর্দির নামে ছিল না। ১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল কলকাতা পুরসভার এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নামকরণ করা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য (১৯৩০-১৯৩৪) তথা শিক্ষাবিদ হাসান সুরাবর্দির নামে। ঘটনাচক্রে, ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা দাসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার হাসান সুরাবর্দিকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
৩. মৌলানা ওবায়েদুল্লা সুরাবর্দি (নথির দাবি)
বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন আধিকারিক তথা পথের নামকরণ উপদেষ্টা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য অজিতকুমার বসুর লেখা ‘কলিকাতার রাজপথ/ সমাজে ও সংস্কৃতিতে’ বইটি। পুরসভার পুরনো নথি ঘেঁটে তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৩৩ সালের লিখিত প্রস্তাব অনুযায়ী এই রাস্তাটির নামকরণ আসলে করা হয়েছিল বিখ্যাত শিক্ষাবিদ মৌলানা ওবায়েদুল্লা সুরাবর্দির নামে।
শিক্ষামহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজ্যের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপিকা সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নামকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন:
“আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো উপাচার্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হিমালয়প্রমাণ অবদান ছিল, তাই তাঁদের নামে রাস্তা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু উপাচার্য হিসেবে হাসান সুরাবর্দির এমন কী উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল? আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার থাকাকালীনও এমন কোনো নথি পাইনি যেখানে তাঁর নামে রাস্তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলকাতার এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম বদল একদিকে যেমন শাসক শিবিরের কাছে ‘ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার’, অন্যদিকে ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে তা এক অমীমাংসিত ঐতিহাসিক বিতর্কের নতুন খোরাক।

