কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলে তীব্র ফাটল ও ভাঙনের জল্পনার মধ্যেই এক নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ করলেন বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। বিধানসভায় দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা (Leader of the Opposition) করার দাবি জানিয়ে যে চিঠি জমা পড়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জানতে ‘তথ্য জানার অধিকার’ বা আরটিআই (RTI) আইনের দ্বারস্থ হলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর দফতরের ‘স্টেট পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার’-এর কাছে এই মর্মে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন কুণাল ঘোষ। চিঠিতে তিনি মূলত জানতে চেয়েছেন, কোন কোন তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের সমর্থনে স্বাক্ষর করেছেন এবং স্পিকার আদৌ তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে অনুমোদন দিয়েছেন কি না।
স্পিকারের দফতরে কুণালের জোড়া আবেদন
তথ্য জানার অধিকার আইনে স্পিকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে দু’টি নথির অনুলিপি (Copy) দেখতে চেয়েছেন কুণাল ঘোষ:
- বিধায়কদের স্বাক্ষরিত চিঠি: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের পক্ষ থেকে স্পিকারকে যে মূল চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তার একটি সম্পূর্ণ কপি। বিশেষত, কোন ৫৯ জন বিধায়ক এই চিঠিতে সই করেছেন, তাঁদের নাম ও স্বাক্ষর খতিয়ে দেখতে চান তিনি।
- স্পিকারের অনুমোদন পত্র: ওই আবেদনপত্রটি গ্রহণ করার পর স্পিকার রথীন্দ্র বসুর পক্ষ থেকে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি বা অনুমোদন দিয়ে পাল্টা কোনও সরকারি চিঠি বা নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে কি না, তার অনুলিপি।
পরিষদীয় দলে অসঙ্গতি, সিআইডি তদন্ত ও বহিষ্কার
সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস মোট ৮০টি আসনে জয়লাভ করেছে। নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন।
তবে দলের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তৃণমূলের পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে শোভনদেবের নাম প্রস্তাব করে স্পিকারকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাতেই প্রথম জালিয়াতি ও অসঙ্গতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। তাঁদের এই মারাত্মক অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধানসভা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে এবং পরবর্তীতে রাজ্য সরকার এই সই জাল-কাণ্ডের তদন্তভার তুলে দেয় সিআইডি (CID)-র হাতে।
গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সই জালিয়াতির অভিযোগে ঋতব্রত ও সন্দীপনের নাম প্রকাশ করেন। এর পরপরই দলবিরোধী কাজের অভিযোগে দু’জনকেই বহিষ্কার করে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু নাটকীয় মোড় নেয় বুধবার, যখন দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করার দাবি জানিয়ে তৃণমূলের ৫৯ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি চিঠি স্পিকারের ঘরে জমা পড়ে এবং খবর ছড়ায় যে স্পিকার রথীন্দ্র বসু সেই চিঠি গ্রহণ করেছেন।
‘বিদ্রোহী ত্রয়ী’ থেকে দূরত্ব ও কুণালের অবস্থান বদল
| সময়কাল | ঘটনাপ্রবাহ ও কুণাল ঘোষের ভূমিকা |
| ১৯ মে (কালীঘাটের বৈঠক) | বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা কালীঘাটের বৈঠকে একই গাড়িতে চড়ে এসেছিলেন ঋতব্রত, কুণাল ও সন্দীপন। সেই বৈঠকে ফলতা কেন্দ্রের প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের সরে দাঁড়ানো এবং দলীয় সংগঠন নিয়ে যৌথভাবে প্রশ্ন তুলেছিলেন তাঁরা। |
| পরবর্তী পরিস্থিতি | সময়ের সাথে সাথে এই ‘বিদ্রোহী ত্রয়ী’র বন্ধনী ভেঙে যায়। কুণাল ঘোষ নিজেকে এই শিবির থেকে সরিয়ে নেন। অন্যদিকে সন্দীপন ও ঋতব্রত জুটি বেঁধে কালীঘাট (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) ও ক্যামাক স্ট্রিটের (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) বিরুদ্ধে লাগাতার তোপ দাগতে শুরু করেন। |
| গত ৭২ ঘণ্টা | ঋতব্রত ও সন্দীপন যত বেশি নেতৃত্ব-বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, কুণাল ঘোষ ঠিক ততটাই কালীঘাটের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থার বার্তা দিয়েছেন। গত তিন দিন ধরে সামাজিক মাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রতদের তীব্র সমালোচনা করতে দেখা গেছে বেলেঘাটার বিধায়ককে। |
রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের অন্দরে যে বড় ধরণের ফাটল ধরেছে এবং পর্দার আড়ালে যে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ চলছে, কুণাল ঘোষের এই আরটিআই (RTI) আবেদন তারই অংশ। কুণাল ঘোষ এই আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত সেইসব বিধায়কদের মুখোশ টেনে খুলতে চাইছেন, যাঁরা খাতায়-কলমে তৃণমূলের টিকিটে জিতলেও গোপনে দল ভাঙার খেলায় লিপ্ত হয়েছেন। এখন স্পিকারের দফতর এই আরটিআই-এর জবাবে কী তথ্য সামনে আনে, তার ওপরেই নির্ভর করছে রাজ্য রাজনীতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি।

