পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।
পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।
ভয় করি কি জানি কে দিবে ফেরফার॥
ঈশ্বরীরে পরিচয় কহেন ঈশ্বরী।
বুঝহ ঈশ্বরী আমি পরিচয় করি॥
বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি।
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী॥

অন্নপূর্ণা পূজা – একটি প্রতিবেদন

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র দেবীর অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে: অন্নদামঙ্গলকাব্য অষ্টাদশ শতাব্দীর
সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের অন্যতম। … “

সমগ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যের কোনো প্রাচীন নির্ভরযোগ্য পুথি পাওয়া যায় না। প্রাপ্ত পুঁথিগুলির লিপিকাল ১৭৭৬-১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে এই কাব্যটি প্রথম মুদ্রিত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৪৭ ও ১৮৫৩ সালে এই গ্রন্থের দুটি সংস্করণ প্রকাশ করেন।পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর কৃত সংস্করণটি আদর্শ ধরে অন্নদামঙ্গল কাব্যের অন্যান্য সংস্করণগুলি প্রকাশিত হয়।

লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, প্যারিসের বিবলিওথেক নাসিওনেল দে ফ্রান্স, এশিয়াটিক সোসাইটি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেএই কাব্যের কয়েকটি প্রাচীন পুথি সংরক্ষিত আছে।

ভারতচন্দ্র স্বয়ং অন্নদামঙ্গল কাব্যকে “নূতন মঙ্গল” অভিধায় অভিহিত করেছেন। কবি এই কাব্যে প্রথাসিদ্ধ মঙ্গলকাব্য ধারার পূর্ব ঐতিহ্য ও আঙ্গিককে অনুসরণ করলেও, বিষয়বস্তুর অবতারণায় কিছু নতুনত্বের নিদর্শন রেখেছেন। অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের ন্যায় অন্নদামঙ্গল গ্রামীণ পটভূমি বা পরিবেশে রচিত হয়নি; এই কাব্য একান্তই রাজসভার কাব্য।

ভারতচন্দ্র এই কাব্যের আখ্যানবস্তু সংগ্রহ করেছিলেন কাশীখণ্ড উপপুরাণ,মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, বিহ্লনের চৌরপঞ্চাশিকা (চৌরীসুরত পঞ্চাশিকা), এবং ক্ষিতীশবংশাবলীচরিতম্ ইত্যাদি গ্রন্থ ও লোকপ্রচলিত জনশ্রুতি থেকে। অন্নদামঙ্গল কাব্যের বৈশিষ্ট্য হল ছন্দ ও অলংকারের সুদক্ষ প্রয়োগ। সংস্কৃত ভাষায় পারঙ্গম ভারতচন্দ্র প্রাচীন সংস্কৃত কাব্যের বিভিন্ন ছন্দ ও অলংকার সার্থকভাবে এই কাব্যে প্রয়োগ করেন। এই কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কাব্য সম্পর্কে মন্তব্য করেন,

রাজসভাকবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল-গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য।’

মাইকেল মধুসূদন দত্ত দেবী অন্নপূর্ণা ও অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রশস্তি করেছেন তাঁর “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি” কবিতায়।

লোকশ্রুতি অনুসারে মা অন্নপূর্ণার পূজার সূচনা ও তার প্রসার করেছিলেন নদিয়াধিপতি কৃষ্ণচন্দ্র। কিন্তু তার পূর্বে অন্নপূর্ণা পূজা কোথায় হত? কাশী র অন্নপূর্ণা মন্দিরে।

কাশী ও বাঙালির জীবন এক সূত্রে গ্রথিত ছিল…ছিল কেন বলছি? এখনো একই আছে। সে ধর্ম হোক বা মৃত্যুর আগে কাশী দর্শন বা কাশী বাস…বাবা বিশ্বনাথ ছাড়াও মা অন্নপূর্ণার মহিমান্বিত কাশী শৈব ও শাক্ত ধর্মে অপূর্ব মিলন স্থল।

মার্কণ্ডেয় পুরাণের কাশীখণ্ড, ভাগবত পুরাণ ও অন্যান্য পুরাণ এবং কাশীপরিক্রমা ইত্যাদি গ্রন্থে দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত নানা কাহিনি প্রচারিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে দুটি কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য –কাশীপ্রতিষ্ঠার উপাখ্যান ও ব্যাসকাশী প্রতিষ্ঠার উপাখ্যান। এছাড়া অন্নদামঙ্গল কাব্যেও অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত কয়েকটিলৌকিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

পার্বতী শিব ও গৃহত্যাগী হয়ে মর্ত্যধামে এলে অন্নের অভাব পূরণের নিমিত্ত শিব তাঁর নিকটই অন্নের সন্ধানে আসেন ও তাঁর দেয়া অন্ন ভিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।

অর্থাৎ দেবী অন্নপূর্ণা রূপে জীবজগতের অন্নের অভাব পূরণ করেছিলেন। তিনিই তাই অন্নদাত্রী, মহাবিদ্যা। সেই রূপেই তিনি কখনো মহালক্ষী , কখনো মহাশক্তি , কখনো মহাবিদ্যা রূপে নানা সময় পূজিতা হন।

চৈত্রমাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে দেবী অবতীর্ণ হন। কাশীতে দেবী অন্নপূর্ণার বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর এই দিনটিতে দেবীর ধুমধাম করে পুজো হয়ে থাকে। এই মন্দিরে অন্নকূট উৎসব বিখ্যাত। এছাড়া এই পুজো অতি প্রসিদ্ধ।

তবে দেবী কাশীধামের মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হন ।কিন্তু তাঁর পূজা আরো প্রাচীন। আমরা নবান্নে যেরূপ সশীষ ধান দিয়ে দেবী লক্ষীর আরাধনা করি সেরূপ কিন্তু কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দিরের পুজোতেও করা হয়। তাই রাঢ় বঙ্গে অনুষ্ঠিত নবান্ন পূজার সঙ্গে এই পূজার অদ্ভুত মিল। আবার চৈত্র লক্ষীর পূজায় সাদা তিল ব্যবহার একান্ত জরুরি।

সুপ্রাচীন হরপ্পা সভ্যতায় যেমন দেবী শাকম্ভরির ন্যায় মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। তিনি ছিলেন শস্যের দেবী। দেবীমাহাত্মতেও শাকম্ভরির উল্লেখ আছে। তিনি নিজের শরীর থেকে অন্ন ও শাক উৎপন্ন করে জীব জগৎকে অনাহারের থেকে রক্ষা করেন। তিনিই অন্নপূর্ণা । তিনিই শস্য শ্যামলা লক্ষী।

গ্রিক দেবী ছিলেন আন্ননা। তারঁ এক হাতে দন্ড ও অন্য হাতে শিঙ্গা। তিনি শস্যদেবী। আবার রোমান দেবী ছিলেন ডিমিতার। পেটের জ্বালা বড় বিষম জিনিস। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, খরা, বন্যা ইত্যাদি হতে মানব কুল প্রকৃতি মাতাকে কখনো শাকম্ভরি, কখনো অন্নপূর্ণা , কখনো জাহের এরা , কখনো ইন্নান, কখনো ইশতার ,কখনো করমপরব, দুয়ার সিনি , পাহাড় সিনি রূপে পুজো করেছেন , আরাধনা করেছেন। এইভাবেই শৈল্যসুতা বাঙালির ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছেন।

শঙ্করাচার্য কৃত অন্নপূর্ণা স্তোত্র

ওঁ নিত্যানন্দকরী বরাভয়করী সৌন্দর্যরত্নাকরী
নির্ধূতাখিলঘোরপাবনকরী প্রত্যক্ষমাহেশ্বরী।
প্রালেয়াচলবংশপাবনকরী কাশীপুরাধীশ্বরী
ভিক্ষাং দেহি কৃপাবলম্বনকরী মাতান্নপূর্ণেশ্বরী ॥
নানারত্নবিচিত্রভূষণকরী হেমাম্বরাড়ম্বরী
মুক্তাহার-বিলম্বমান বিলসদ্বক্ষোজ-কুম্ভান্তরী।
কাশ্মীরাগরুবাসিতা রুচিকরী কাশীপুরাধীশ্বরী
ভিক্ষাং দেহি কৃপাবলম্বনকরী মাতান্নপূর্ণেশ্বরী ।।

তিনি শক্তির এক রূপ। অন্নপূর্ণা দ্বিভূজা, তাঁর দুই হাতে অন্নপাত্র ও দর্বী; তিনি রক্তবর্ণা, সফরাক্ষী, বিচিত্র বসনা, নিরত অন্নপ্রয়াদিনী ও ভবদুঃখহন্ত্রী; তাঁর মস্তকে নবচন্দ্র,
একপাশে ভূমি ও অন্যপাশে শ্রী। নৃত্যপরায়ণ শিবকে দেখে তিনি সন্তুষ্ট হন।দেবী পার্বতী ভিক্ষারত শিবকে অন্নপ্রদান করে এই নাম প্রাপ্ত হন। চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণার পূজা করা হয়।

অন্নপূর্ণার পূজা করলে গৃহে অন্নাভাবথাকে না।

দক্ষিণামূর্তি সংহিতা গ্রন্থে চতুর্ভূজা এবং পদ্ম, অভয়, অঙ্কুশ ও দান হস্তা অন্নপূর্ণার বর্ণনা রয়েছে।

কৃষ্ণানন্দ রচিত তন্ত্রসার গ্রন্থে এই পূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। অন্নপূর্ণা পূজা কালী ও জগদ্ধাত্রী পূজার মতোই তান্ত্রিক পূজা।

কলকাতার রানীরাসমনির বাড়ি থেকে শুরু করে বহু বনেদি বাড়িতে অন্নপূর্ণা পূজা হয়। তবে এক্ষেত্রে বেহালার বড়িশা সাবর্ন রায়চৌধুরীদের বড় শরীকের অন্নপূর্ণা মন্দিরের কথা বিশেষ উল্লেখ্য।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের চন্দ্রকান্ত রায়চৌধুরী তৎকালীন বড়িশা গ্রামে বড়বাড়ির মধ্যে ১৮৫০ সালে একটি পঞ্চরত্ন মন্দিরে অষ্টধাতুর দেবীমূর্তি এবং রুপোর শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দির প্রতি‌ষ্ঠার নেপথ্যে শোনা যায় এক কাহিনি।

চন্দ্রকান্তের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। তাঁর দুই স্ত্রী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা কাশীবাসী হবেন। চন্দ্রকান্ত তাঁদের কাশী যাওয়া আটকাতে বাড়িতেই দেবীর মন্দির তৈরি করেন। দেবী অন্নপূর্ণা ছাড়াও জোড়া শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। একে বলে গৃহী শিবের মন্দির। পরে ১৯৫৬ সালে চন্দ্রকান্তের প্রতিষ্ঠিত অন্নপূর্ণা বিগ্রহটি চুরি হয়ে যায়। ১৯৬৮ সালে পুরনো মন্দির ভেঙে নতুন মন্দিরটি তৈরি করা হয়। এবং ১৯৬৯ সালে নতুন বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে মন্দিরের আংশিক সংস্কার করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা পুজো উপলক্ষে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়।

মনে আছে ছোট বেলায় আমি পুজো নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করলে ঠাকুমা রাজা সুরথ, দেবীমাহাত্মম, চণ্ডাল দের মাতঙ্গী পূজা, দেবীর অন্নপূর্ণার কথা এসব গল্প শোনাতেন।প্রতি ফি বছর আমি প্রশ্ন করতাম।উত্তর পেতাম অনেক প্রাচীন পুরান , শাস্ত্র কাহিনী।আসলে ভালো লাগত । আগ্রহ ছিল ভারী এসব জানার।

বাসন্তী অষ্টমীর দিন আমি ভোরে উঠে স্নান করে পিসীদের সাথে বড় বাড়ির অন্নপূর্ণা মন্দিরে যেতাম। ধুম ধাম করে পুজো হত। আমি ছোট বলে একদম সামনে বসার অধিকার পেতাম। সামনে বসে অষ্টধাতুর দেবী মূর্তি , রুপোর শিব সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম।বাড়ি গিয়ে প্রশ্ন করতে হবে তো তাই।

ওই দিন নিমন্ত্রণ থাকত অনেক জায়গায় অন্নপূর্ণা পুজোর। প্রসাদী খিচুড়ি, লাবরা আর পায়েস ছিল অমৃত।

এখনো প্রতি বছর সময় সুযোগ বুঝে চলে যাই মন্দিরে। ভারী নস্টালজিক লাগে। চৈত্র অবসানে ,মিঠে ভোরের হাওয়ায়, সুপ্রাচীন বট গাছ গজানো শিব মন্দির, রথ তলা আর অন্নপূর্ণা মন্দির… বড় স্বর্গীয় অনুভূতি হয়….

আমি দেবী অন্নপূর্ণা প্রকাশ কাশীতে।

চৈত্র মাসে মোর পূজা শুক্ল অষ্টমীতে ॥

কত দিন ছিনু হরিহোড়ের নিবাসে।

ছাড়িলাম তার বাড়ি কন্দলের ত্রাসে ॥

ভবানন্দ মজুন্দার নিবাসে রহিব।

বর মাগ মনোনীত যাহা চাহ দিব ॥

প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে।

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ॥

তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান।

দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান ॥

দুর্গেশনন্দিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.