ঈশ্বরের নাম তো মঙ্গলের জন্য করা হয়৷ ভগবানের নাম জপ করে শান্তি মেলে কিংবা বিপদমুক্ত জীবন চাওয়া হয় ৷ আবার ভগবানের নাম মনোবল বাড়ায়, কর্মক্ষমতা বাড়ায় বলেও অনেক মানুষ মনে করেন৷ কখনও বা কুশল বিনিময়ে সময় ভগবান কিংবা গুরুর নাম করার প্রথা রয়েছে এদেশে৷ কিন্তু আবার যদি ভগবানের নামের মধ্যে আগ্রাসন অথবা আস্ফালন লুকিয়ে থাকে? তখন কিন্তু সেই ভগবানের নামটাও ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে৷ সেই জয়ধ্বনিতে শান্তির বদলে যেন অশান্তির ইন্ধন থাকে৷

কেউ বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় যাতে সে বিপদমুক্তভাবে গন্তব্য স্থানে পৌঁছতে পারে সে কামনা করে বাড়ির লোক ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলে৷ পরীক্ষার আগে কিংবা কোনও কঠিন কাজ করার আগে হয়তো একটু বেশি করেই সরস্বতী কিংবা কালী অথবা শীতলা ঠাকুরকে নমস্কার করে ফেলেন অনেকে৷ ভগবানের নাম মনোবল বাড়ায়, কর্মক্ষমতা বাড়ায় বলেই তো বিশ্বাস করে মানুষজন৷ আবার এ বঙ্গেও খেটে খাওয়া একদল মানুষকে দেখা যায় ভারী মালপত্র তুলতে তুলতে কিংবা কাজ করার পরে টাকা বা বকশিস পাওয়ার পর হাসিমুখে ধন্যবাদ স্বরূপ নমস্কার করতে করতে ‘রাম রাম বাবু’ কিংবা ‘সিয়া রাম’ বলতে৷

অন্যান্য উত্তর ভারতীয়দের তুলনায় বাঙালি রাম নাম কমই উচ্চারণ করে থাকে৷ শশ্মানে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় সাধারণত ‘বলো হরি হরি বোল’ বলারই রেওয়াজ রয়েছে তবে কেউ কেউ ‘রাম নাম সত্য হে’ বলে থাকে৷ সেটা হয়তো অবাঙালি সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের প্রভাব৷ তবে সেই রাম নামে কোনও আঘাত নেই, কোনও বিবাদ নেই বরং সহমর্মিতা আছে৷ কিন্তু যখন ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে দিতে কেউ কোনও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে আঘাত করতে অথবা ধর্মস্থান নষ্ট করতে এগিয়ে আসে তখন তো সেটা অবশ্যই ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে ৷

আবার এটাও তো ঠিক কেউ জয় শ্রী রাম বললেই সেটা আঘাতের উদ্দেশ্যেই বলছে সেটা আগে থেকে ভেবে নেওয়াটাও উচিত নয়৷ বিশেষত তেমন পরিস্থিতিতে বড় নেতা নেত্রীদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া উচিত সঠিক বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে যাতে গন্ডগোল না বাড়ে ৷ হাসি মুখে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বললে অনেক সময় তাদেরও মন জয় করা যায়৷ তা না হলেও অনন্ত একটা ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত হল অনেক কিছু অগ্রাহ্য করলে তা বেশি বাড়ে না বরং থিতিয়ে যায়৷ তাছাড়া মানুষের স্বভাব হল যদি লক্ষ্য করে কেউ কোনও কথায় রাগছে তখন এক প্রকার মজা পেতে বা তাঁকে রাগিয়ে দিতে সেই শব্দগুলি তার সামনে বলতে থাকা৷ তখন সেই শব্দ কয়েকটি খারাপ শব্দ না হলেও ওই পরিস্থিতিতে ক্রমশ সেগুলিই যেন গালাগাল বা টিটকিরির মতোই শোনায় সেই ব্যক্তির কাছে৷

জয় শ্রীরাম ভগবানের নাম হলেও সদ্য শেষ হওয়া লোকসভা নির্বাচনের সময় এ রাজ্যে বিজেপি এবং তৃণমূলে লড়াই এমন মাত্রা পেয়েছিল যাতে বিরোধী দলের এই স্লোগানটিও সহ্য করতে পারছিলেন না রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ শুধু তাই নয়, বিরোধী স্লোগান সহ্য করতে না-পেরে এমন আচরণ করেছেন যা তাঁর পদমর্যাদায় আদৌ শোভা পায় না৷ লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে একদিন মেদিনীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় যাবার সময় পথে কিছু লোক তাঁকে উদ্দেশ্য করে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিলে তিনি তখন গাড়ি থেকে নেমে তেড়ে যান যারা জয় শ্রীরাম বলেছে তাদের দিকে৷ একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এমন আচরণ ভাবা যায় না৷ তাঁর এমন প্রতিক্রিয়া দেখে দেশজুড়ে শোরগোল ওঠে৷ প্রশ্ন উঠেছে- এ বঙ্গে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের নাম করাটা কেমন করে নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে? কেমন করে ওই শব্দগুলি এখানে গালাগালে পরিণত হচ্ছে ? পাশাপাশি আবার মুখ্যমন্ত্রীর মতো পদমর্যাদার এমন মানুষের এহেন আচরণের জন্য হাসাহাসি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ শুরু হয়েছে৷

এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় নেত্রী কিন্তু তিনিও এক সময় দলীয় সাধারণ কর্মী ছিলেন৷ সাতের দশকে কংগ্রেসের সাধারণ কর্মী থাকাকালীন তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন বলে কথিত ৷ তাছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের দেখে বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদের কালো পতাকা দেখানো বা বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া গণতন্ত্রের অঙ্গ বলেই তো ধরা হয় ৷ কিন্তু তিনি সেদিন অমন আচরণ করার বদলে তা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এড়িয়ে চলে যেতেন পারতেন তাহলে বোধহয় এমন ব্যঙ্গ বিদ্রুপের বস্তু হয়ে যেতেন না৷ কারণ একই ধরনের অবস্থায় পড়লেও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী অন্যভাবে পরিস্থিতি ম্যানেজ করেছিলেন৷

মমতার অমন আচরণের কয়েকদিন পরেই মধ্যপ্রদেশের ভোট প্রচারের সময় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াংকা গান্ধী কনভয়ের সামনে একদল বিজেপি সমর্থক মোদীর সমর্থনে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে থাকেন৷ তা দেখে অবশ্য রাজীব গান্ধীর কন্যা মমতার মতো আচরণ করেননি৷ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন হাসিমুখে৷ গাড়ি থেকে নেমে এসে ওই বিজেপি সমর্থকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘‘ আপনাদের দিক থেকে আপনারা ঠিক আমার দিক থেকে আমি ঠিক৷’’ বেস্ট অফ লাক জানান তাদের৷ এমনকী এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন তৃণমূল নেতা মদন মিত্র এবং দিনেশ ত্রিবেদীর সামনে অর্জুন সিং এর সমর্থকরা জয়শ্রীরাম ধ্বনি দেয় কিন্তু তাতে ক্ষোভ প্রকাশ না করে ‘রামচন্দ্রের জয়’ বলে এই দুই নেতাই হেসে সেই স্থান থেকে দ্রুত বেড়িয়ে যান ৷

ভোটের মরশুমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে দেখে তাঁর তেড়ে যাওয়ার যে কোনও ফল হয়নি তা বোঝা গেল বৃহস্পতিবার৷ কারণ এদিন নৈহাটি যাওয়ার পথে ভাটপাড়ায় সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ির সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিল কিছু লোক আর তা শুনেই মেজাজ হারিয়ে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার লোকদের সঙ্গে ঝগড়া করতে নেমে গেলেন তিনি৷ পুলিশ প্রশাসন তো রয়েছে রাস্তার লোকগুলি কোন অন্যায় করলে তাদের শায়েস্তা করার জন্য, সেক্ষেত্রে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর তাদের দিকে তেড়ে যাওয়াটা বড্ড বেমানান লাগে৷ তিনি একবার শুধু ভেবে দেখুন এভাবে তাঁর গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে আসায় মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটার মর্যাদা থাকছে কি না ?

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.