অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত বাঙ্গালির চিন্তা-ভাবনা বাংলা তথা ভারতের পুনরুজ্জীবনের ইতিহাসে এক সুদৃঢ় প্রভাব বিস্তার করেছিল, এই সত্য সকলেই কমবেশি স্বীকার করবেন। এক সময় বলা হতো, বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজই জাতির মেরুদণ্ড। কারণ দেশ ও সমাজের যাঁরা মাথা তারা প্রায় সবাই এই সমাজের মধ্য থেকে উঠে এসেছেন। তা শিক্ষা-দীক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, চিকিৎসা, আইন, রাজনীতি, খেলাধুলা যাই হোক না কেন। কিন্তু পাশাপাশি একথাও সত্য, বিশশতকের বাঙ্গালিকে পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা গ্রাস করেছিল। কবির আক্ষেপোক্তিতেও তার প্রমাণ মেলে—‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধা জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে, মানুষ করনি।
যে-বাঙ্গালির আজও মনুষ্যত্ব অর্জনের ক্ষমতা বা ইচ্ছা আছে, দুর্ভাগ্যক্রমে তারা সকলেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর ভাষায় ‘নব্যতম নৈয়ায়িক বা নব্যতম স্মার্ত’ হয়ে গিয়েছেন। …তাহারা বড়াই করিয়া বলেন, ‘আমরা মার্কসিস্ট।’ বিশেষত, সত্তর বছর আগে ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতাদের দেশভাগ বাঙ্গালিকে এক সীমাহীন বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। গত সাত দশকেও এর থেকে পরিত্রাণ পায়নি বাঙ্গালি বা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে হিন্দু বাঙ্গালি। দেশভাগের কারণে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে এই মার্কসিস্ট বা কমিউনিস্টরা একের পর এক আন্দোলন চালিয়েছিল। উদ্বাস্তুদের জন্য কলোনি পত্তন আন্দোলন, ট্রামের এক পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, নকশালবাড়ি আন্দোলন। এইসবের ফলে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হলো। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ শুধু এই পাঁচবছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চারবার বিধানসভার ভোট ও চারবার রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়েছে। রাজনৈতিক এই দলাদলির ফলে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক জাতপাতের সৃষ্টি হলো। যার পরিণাম দলীয় সংঘর্ষ, খুন, জখম, অপহরণ। সেই ট্রাডিশন এখনও চলছে। বস্তুত ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ – এই তিরিশ বছর পশ্চিমবঙ্গে খুবই উত্তাল সময় গেছে।
গত পঞ্চাশ বছরে পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক স্থিতি এবং জনভারসাম্য অনেকটাই বদলে গেছে। আজ সমাজে সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা কমেছে। ফ্যান, টিভি, ফোন বহু পরিবারেই আছে। বহু বাড়িতে বাড়তির মধ্যে আছে ফ্রিজ, ওয়াশিংমেশিন, গাড়ি। এখন এরাজ্যে ইংরেজিমাধ্যম স্কুলগুলিরই রমরমা। ১৯৯০ সাল থেকেই কলকাতার বাংলামাধ্যম স্কুলগুলি ধুঁকতে শুরু করেছে। ইংরেজি আজ বাঙ্গালির অস্থিমজ্জায় এমনভাবে ঢুকে গেছে যে দাদু তার বছর চারেকের এক নাতনিকে স্কুলের গেটের কাছে বলছেন—No my child. Do’nt be silly. come this side. এখন কলকাতার বাড়ির নম্বর, নেমপ্লেট, দোকানের সাইনবোর্ড— সবই প্রায় ইংরেজিতে। ‘আমার এই বাংলা ভাষা’— আজ শুধু কথার কথা।
আগে একটা পারিবারিক শাসন ছিল। এমনকী পাড়ার বড়োদেরও শাসনের অধিকার ছিল। এখন ছাত্রের কান মূললেও অভিভাবকদের কাছে শিক্ষকদের কৈফিয়ত দিতে হয়। ভাই-বোনের সংখ্যা বেশি থাকায় ভাগ করে খেতে শিখত। এখন উল্টো। নিজেরটা না পেলে বাবা-মাকেই হুমকি দেয়। এছাড়া অ্যানড্রয়েড ফোন আসায় সত্যিই ‘দুনিয়া মুঠ্ঠি মে’। বিশ্বজুড়ে এই ভোগবাদের প্রাবল্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিবার ও সমাজ প্রভাবিত। আত্মকেন্দ্রিকতা যার মূল কথা।
আর এক কথা। দেশভাগের আগে যৌথ পরিবারের প্রচলন ছিল। প্রতি পরিবারে গড় সন্তান সংখ্যা ছিল অন্তত ছয়-সাত। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, ‘হাম দো’— হয়তো খুব বেশি হলে ‘হমারা দো’। তারা প্রায় সবাই এক সন্তান বা One child Family আঁকড়ে ধরেছেন। এর পরিণতিতে হিন্দু সমাজে জনবৃদ্ধির হার আজ শূন্যে, ঠিকঠিক খতিয়ে দেখলে তা বিয়োগান্তে বা মাইনাসে (-) এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালি হিন্দুসমাজ আজ ক্রম সঙ্কুচিত। ভারতের পাঞ্জাব ছাড়া আর কোনও রাজ্য দেশভাগের যন্ত্রণায় এমন ক্ষতবিক্ষত হয়নি। বরং সেই জ্বালা ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতাদের দৌলতে আজ এক বিকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলিতে ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশির অনুপ্রবেশ ঘটছে ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা সংগঠিত হচ্ছে। পুরো পশ্চিমবঙ্গটাই এখন খাগড়াগড়— ইসলামি মৌলবাদীদের অস্ত্র তৈরির কারখানা হয়ে উঠেছে। পরিকল্পিতভাবে এ রাজ্যের জনভারসাম্যের পরিবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গ কি পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে–এই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তবে আশার কথা এই, এতসবের পরেও বাঙ্গালির সমাজের একাংশ, বিশেষত নবীন প্রজন্ম নিজেদের পরম্পরা ও সংস্কৃতিকে যুগানুকুল করে অন্তত কিছুটা হলেও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছে। বিকাশ ও প্রযুক্তিকেও কাজে লাগাচ্ছে। কামদুনি বা বারাসতের মতো নারী লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে, দেগঙ্গা, বসিরহাটে বা হাওড়ার তেহট্ট স্কুলে মৌলবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো মনীষীদের অবদানকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায়, দেশ ও জাতীয় জীবন গঠনে রাম, কৃষ্ণ, শিবাজী, রাণা প্রতাপের মতো ঐতিহাসিক পুরুষদের স্মরণ-মননে, দেশ ও দুনিয়ার চলমান ঘটনা বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নজরকাড়ার মতো। নবীনদের এই নবচেতনায় উদ্দীপ্ত হওয়াই নতুন বছরের শুরুতে এক আশার আলো বলে মনে হচ্ছে।

বিজয় আঢ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.