​গোটা হুগলির যে রাস্তা দিয়েই আপনি যান, পাশের মাঠগুলোতে আজ তাকালে দেখবেন স্তুপ। রাঢ়ের একমাত্র অর্থকরী ফসল আলুর স্তুপ। আবহাওয়ার কল্যাণে এই বছর ফলন তুলনামূলক ভাল হয়েছে।

আলু বিক্রি করেই কৃষক তার সারাবছরের রসদ সংগ্রহ করে, ধারদেনা মেটায়, ছেলের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ের টাকা, স্ত্রীর চিকিৎসা সব সমস্যার একটাই সমাধান: আলুর ফলন ও তার উপযুক্ত দাম। ফলন ভাল হওয়ায় এই বছর দাম খানিকটা কম থাকবে, এই আশঙ্কা ছিলই। প্রতিবছরই থাকে। কম হয় বেশী হয়, লাভ হয় লোকসান হয়, বাজারের নিয়মে। আলু বাজার নির্ভর ফসল। ছোট বড় মাঝারি ব্যবসায়ীরাই এর যাবতীয় ওঠানামার প্রধান ক্রিড়নক। সুদীর্ঘ বাম শাসনকালে সাধারণভাবে সরকার এরমধ্যে নাক গলায়নি। গলানো উচিৎ ছিল। কৃষিজাত দ্রব্যের সঠিক বিপননের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিনির্ধারণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার তা করেনি। তাই কোনও বছর কৃষক নূন্যতম লাভের মুখ দেখেছে৷ কোনও বছর প্যাকেট প্যাকেট আলুন এনে রাস্তায় ঢেলে বিক্ষোভ দেখিয়েছে কৃষক, এই ছবি নতুন নয়। যেবছর আলুর ভাল ফলন ও দাম পায় চাষী, সেই বছর বাজার চাঙ্গা থাকে; যে বছর পায় না, বাজার ঝিমোতে থাকে পরের বছর আলু ওঠা পর্যন্ত। এটাই রীতি। তবু সরকার এরমধ্যে খুব বেশী নাক গলায় না। যদিও গলানো উচিৎ। কারণ বাজারের হাতে কৃষকের ভবিষ্যৎ ছেড়ে রাখলে যেকোনও সময় বিপর্যয় নামতে পারে। তেমন বিপর্যয়ও নামেনি বাংলার কৃষিনির্ভর গ্রামগুলিতে, এমন নয়।

কিন্তু সরকার বাজারে নাক গলায়নি কেন? কারণ সম্ভবত বামফ্রন্ট সরকার জানত যে, এটা কোনও হঠকারিতায় সমাধানের বিষয় নয়। বাজারকে নিজের গ্রিপে আনতে গেলে যে শক্তির প্রয়োজন সরকারের, তা তৈরি করাটা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফলেই অর্জিত হতে পারে। তা না করে কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে কৃষকের যে সর্বনাশ হবে, তার পরে সেই কৃষককে নিয়ে ব্রিগেডের রাজনীতি সম্ভব হবে না। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে কলেজের প্রফেসর পর্যন্ত সিপিএমের যে সদস্যরা চাকরি পার্টি ও পরিবার সামলে আলু ব্যবসায় পার্টটাইম অংশ নিত, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত সরকার কোনও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় এলে। সিপিএম ছিল এক কায়েমি শক্তি। ক্ষমতা কায়েম রাখতে যা করা দরকার ও যা নয়, তা খুব ভালই বুঝত। ওরা পরিবর্তন করতে আসেনি। ওরা এসেছিল ক্ষমতা উপভোগ করতে, করেছে। এক্ষেত্রে ওরা হঠকারী ছিল না।

হঠকারিতা হল আজকের সরকারের মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ। একছর আগে যখন অফ সিজিনে আলুর বাজার মূল্য কেজিপ্রতি ২০-২২ টাকা ছাড়িয়ে গেল, সরকার দ্বিতীয়বার না ভেবে, এরাজ্য থেকে আলু অন্য রাজ্যে যাওয়া কঠোরভাবে রুখে দিল। আলুতে যে ইনভেস্টমেন্ট, তার সম্পূর্ণ ফায়দা ব্যবসায়ীরা তোলে এই সময়েই। বছরের যে সময় এক প্যাকেট আলু (৫০কেজি) বিক্রি করা যায় কমবেশি ৫০০ টাকায়, ব্যবসায়ীরা সেই সময়টার কথা ভেবেই হার্ভেস্টিং-এর সিজিনে চাষের মাঠ থেকে প্রতি প্যাকেট আলু এমনকি ৩৫০ টাকাতেও কিনে নিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু যখন পিক সিজিনে সরকার হঠাৎ আলুর ইন্টারস্টেট বিজনেস বন্ধ করে দিল, ব্যবসায়ীরা পড়ল সমূহ ক্ষতির মুখে। পরবর্তী বছরে তারা আর সাহস করল না কিঞ্চিতধিক বেশী মূল্য চাষীকে দিয়ে মাঠ থেকে আলু ক্রয় করতে। সরকার নাক গলালো বাজারে। কিন্তু কোনও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে নয়। ফলে বাজারে যা হল তা কেবল একটা ডিসটার্বেন্স, যা থেকে না ব্যবসায়ী না কৃষক কেউই লাভবান হল। সরকার রেশনে আলু বিক্রি করে কলকাতার মিডিয়ার নজর কাড়ল। ব্যস! ওইটুকুই।

হঠকারিতা এই সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বস্তুতঃ, এই সরকার যা করে তা হঠকারিতার সঙ্গেই করে। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান মিডিয়ার সামনে বসে প্রশাসনিক মিটিং করেন। একে ওকে ধমকে চমকে রিপোর্ট নেন, ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে হাততালি কুড়িয়ে প্রসাদ লাভ করেন। মারাত্মক প্রবণতা। এভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে সর্বনাশের কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকে না। এবং এবারে আলুর বাজারে যে কাণ্ডটি করল এই সরকার, কী বিপর্যয় অপেক্ষা করছে চাষীদের জন্য, তার সীমাপরিসীমা নেই। কোনও প্রয়োজন ছিল না হার্ভেস্টিং-এর সিজিনে কোনও ইনফ্রাস্টাকচার ছাড়া আলুর সহায়ক মূল্য ঘোষণা করার। সরকারের ক্যাপাসিটি নেই যে এত আলু কিনে নেবে। তাহলে এরকম হঠকারী ঘোষণার দরকার কী ছিল?

এক কুইন্টাল আলু ফলাতে ফার্টিলাইজার পেস্টিসাইড ভিটামিন লেবারচার্য সবকিছু মিলিয়ে কম করে ৬০০ থেকে ৬৫০টাকা খরচ হয় কৃষকের। নিজের শ্রমের মূল্য সে কমই আশা করে। বস্তুতঃ, ওই শ্রমের মূল্যটুকুই তার লভ্যাংশ। এবার সরকার আলুন নূন্যতম সহায়ক মূল্য নির্দিষ্ট করে দিল মাত্র প্রতিকেজি ৫.৫০টাকা। অর্থাৎ প্যাকেটপ্রতি ২৫০টাকা। মানে প্রতি কুইন্টাল ৫০০টাকা। অর্থাতকিনা, প্রতি কুইন্টালে এক্ষেত্রে কৃষকের লোকসান ১০০টাকা। সরকার এত কম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করার পর, কেন কোনও ব্যবসায়ী এর বেশী দামে পণ্য ক্রয় করবে?

অন্যান্য সময়ে মাঠে আলুভাঙা শুরু হতেই ব্যবসায়ীদের আনাগোনা শুরু হয়, দরদাম চলে ও বিকেলের মধ্যে কাঁটা নিয়ে ব্যবসায়ী হাজির, সব আলু তুলে নেয় নিজের দায়িত্বে। এতে কৃষক ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত নিশ্চয়ই হয়। কারণ তিনমাস পর আজ ব্যবসায়ী যে আলু ৩০০ টাকায় কিনছে, তা-ই খুচরো বাজারে ছাড়বে ৫০০টাকায়। অগাধ লাভ। চাষীকে মাত্র ৩০০ নিয়েই খুশী থাকতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না কিনলে চাষীর তো সেই অওকাত নেই যে সে নিজে কৃষিজাত পণ্যকে বাজারজাত করবে! সিস্টেম পুরো বাতিল করে পুরো ব্যাপারটিকে সরকার যদি না নিজের হাতে নেয়, তাহলে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। গরিব কৃষকের উন্নতি বা তার জীবন ধারণের মানোন্নয়নের কোন সদুদ্দেশ্য নিয়ে বামফ্রন্ট সরকার পরিচালিত হয়নি। কিন্তু তারা অন্তত এরকম হঠকারিতা দেখায়নি। স্থিতাবস্থাকে জিইয়ে রেখে নিজেদের ফায়দা করে গেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার তো আসলে একটা স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো। এর কোনও সিদ্ধান্তই সুদূরপ্রসারী ফলাফল ভেবে নেওয়া নয়। এভাবে খয়রাতিমূলক প্রকল্প যেমন কন্যাশ্রী যুবশ্রী চলতে পারে, বাজারে হস্তক্ষেপ সম্ভব নয়। কিন্তু যার কোনও ভিশন নেই ক্ষমতা ছাড়া, তার কাছে কীভাবে কেউ আশা করবে একটা সুদীর্ঘ ফলদায়ক সিদ্ধান্তের?

আলু উঠে গেছে, ব্যবসায়ীরা উধাও। কেউ মাঠে আসছে না আর। সরকার নূন্যতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে দিয়ে চুপ করে বসে আছে। ব্যবসায়ী এই পরিস্থিতিতে আলু কিনে তার মূলধন নয়ছয় করবে না। চাষী এখন নিজে গিয়ে তেল দিচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সে দাম দিচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা প্রতি প্যাকেটে। যে ফসল ফলাতে প্রতি প্যাকেটে চাষীর খরচ হয় ২৫০ থেকে ৩০০টাকা, তা সে কী করে ১৫০-এ বিক্রি করবে? কী দিয়ে সারের দোকানের ধার, ব্যাঙ্কের ঋণ মিটিয়ে পরের বছর পর্যন্ত চালাবে সে তার সংসার? পরের সিজিনে চাষটাই বা হবে কীভাবে?


চাষী আলু বেচছে না। মাঠে জড়ো করে রাখছে স্তুপাকারে।

 
কী হবে তারপর?কৃষকের নির্বিকার উত্তর, ‘দেখা যাক!’ 


সে নির্বিকার। কারণ সে জানে তার হাতে হাফবোতল লিকুইড কীটনাশক আছে। যখন কোনও উপায় না থাকবে খালের ধারে গিয়ে ওটা গলাধঃকরণ করবে। পরের সকালে যখন হৈচৈ শুরু হবে। পার্থ চ্যাটার্জি সাংবাদিক বৈঠকে বলবেন, ‘ও পারিবারিক অশান্তির জেরে মারা গেছে।’ এরপর উনি চলে যাবেন কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে মদত দিচ্ছে, সেই বিষয়ে। রমজান মাস, হজ, সংখ্যালঘু গুরু নিয়ে বচন দিলেই তাঁর দল ভোটে জিতে যাবে। কেন্দ্রীয় সরকারও পাকিস্তান কীভাবে জঙ্গীবাদের আশ্রয়, সেই নিয়ে ব্যস্ত হবে। কারণ তা করেও সে ভোটে জিতবার আশা রাখে।

মাঠে স্তুপাকারে জমে আছে বহুমূল্য ফসল, প্রতিদিন সকালে তাকে খুলে দিতে হয়, রোদ খাওয়াতে, রোদ না লাগলে আলু পচে যায়। সন্ধ্যায় ঢাকা দিতে হয়, কারণ শিশিরকণা আলু পচিয়ে দেবে। সারারাত তারপর সেই স্তুপের ওপর বসে থাকতে হয় চাষীকে মাথায় গামছা বেঁধে হাতে লাঠি নিয়ে, নইলে মাঠ থেকে আলু চুরি হয়ে যাবে। হঠাৎ এক পশলা  বৃষ্টি হলে যখন ঠাণ্ডার আমেজ আরও দুদিন থেকে যাওয়ার আশায় আমি আপনি উল্লসিত হব, চাষীর তখন  সব শেষ।


সকালে খালের ধারে লাস মিলবে, মুখে গ্যাঁজলা, পার্থবাবু সাংবাদিক বৈঠক করে সাতদফায় কেন ভোট সেই নিয়ে বলবেন, সিপিএম বলবে কেন্দ্রীয় বাহিনী চাই, বিজেপি পাকিস্তানকে গালাগাল দেবে, প্রগতিশীলরা আজাদির দাবীতে মিছিল করবে…


আর কৃষকের দেহাতি বউ উঠোনে আছাড়িপিছাড়ি করে কাঁদবে, তার ছেলে সাদা ধুতি, কোমরে কম্বলের সস্তা আসন, গলায় উত্তরীয়, হাতে শুকনো একটা কঞ্চি নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াবে!

সুজিত দাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.