আপনারা মার্ক্সপুজো করুন। বাগদেবীর পূজা করে বিদ্যা ও বিজ্ঞানচর্চা করার জো আপনাদের নেই।

বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য্য মহাশয়,

বীণাধারিণী পুতুল দেখে আপনি যে তাকে সরস্বতীমূর্তি বলে চিনতে পেরেছেন তার অর্থ দেবী সরস্বতীর রূপকল্প সম্পর্কে আপনি অবগত। চিনলেন কি করে যে ঐটি দেবী সরস্বতীর মূর্তি? তবে চিনতে পেরেছেন দেখে ভালো লাগল।

একটি প্রশ্ন না করলে নয়।— বৃটিশরা শুধু নিউটনকে রেখেছেন বলে আমাদেরও কোনো একজনকেই রাখতে হবে, এ আবার কি আহ্লাদ মশাই? আমরা যদি আমাদের বিজ্ঞান ভবনের সামনে নিউটন, আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, মহর্ষি কণাদ, জন ডালটন, আর্যভট্ট, চরক, সুশ্রুত, জীবক, নাগার্জুন, গার্গী, মৈত্রেয়ী, অপালা, ঘোষা, যাজ্ঞবল্ক্য, বশিষ্ঠ, জাবালি, বেদব্যাস, বাল্মীকি, অন্যতম ঋক রচয়িত্রী মহর্ষি বাক, শ্রীধর আচার্য, সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা, হরগোবিন্দ খুরানা, ইউ এন ব্রহ্মচারী, ল্যুই পাস্তুর ইত্যাদি পৃথিবীর তাবড় পণ্ডিতের একত্রীকৃত রূপ হিসাবে বাকদেবীকে কল্পনা করে থাকতে পারি, এবং আপনার বা বৃটিশদের কল্পনাশক্তির প্রসার যদি অতখানি না হয়ে থাকে, তার জন্য আমাদেরকে কম্প্রোমাইজ করতে হবে কেন? বৃটিশরা পারে নি, আপনারা পারছেন না, তাই বলে আমাদের কল্পনাশক্তি ও সমর্পণশক্তিকে খর্ব করে অসীম পাণ্ডিত্যের অনন্ত অধিকারিণী দেবী সরস্বতীর স্থানে কোনো একজনমাত্র মানবমূর্তিকে বসাতে হবে কেন? “তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন”?

কম্যুনিস্টদের চিরকালের নীতি হল যার আছে তার থেকে কেড়ে নিয়ে তাকে ছোট করার নীতি। তাই আমাদের বিদ্যা-আরাধনার উদার প্রসারটিকে সংকুচিত করে কোনো একজন আর্যভট্ট বা একজন চরক বা একজন সুশ্রুতে এনে ফেলতে চাইছেন আপনি। কিন্তু তা হওয়ার নয়। দেবী সরস্বতীর মধ্যে সর্ববিদ্যার অধিবাস। তাঁকে স্মরণ করলে অনাদি অতীত থেকে অনন্ত ভবিষ্যত পর্যন্ত সকল পণ্ডিতবর্গকে স্মরণ করা হয়ে যায়, আর আমরা সেটি করব। বিদ্যা, বুদ্ধি, ধী, প্রজ্ঞা, স্থিতি, মেধা— সকল শব্দ স্ত্রীলিঙ্গবাচক। সকল বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে আমরা বাকদেবীর পূজা করি বলে আপনার গায়ে লাগছে কেন? বামন হতে চান, আপনারা হোন। আপনি না হয় ঐ মূর্তির মধ্যে কেবলমাত্র আপনার মার্ক্সবাবাকেই দর্শন করার চেষ্টা করুন না কেন? দেবীমূর্তি দেখামাত্রই যখন মা সরস্বতীকে চিনতে পেরেছেন, বা না চাইতেও যখন রেকগনিশন দিয়ে ফেলতে বাধ্যই হয়েছেন বাকদেবীকে, তখন চেষ্টা করলে ঐ মূর্তির মধ্যে মার্ক্সবাবাকেও হয়ত…

…কিন্তু তা বলে আপনাদের মত আমাদেরকেও বামন হতে বলবেন না। বিলীন যদি হতেই হয়, আমরা সিন্ধুতেই বিলীন হব, বিন্দুতে নয়।

পুনঃ — বিজ্ঞান সাধনার কথা বলা আপনার জন্য কি একান্তই নেসেসারি ছিল? ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু কি ঠেকানো যেত না? কম্প্যুটারাইজেশনের বিরোধিতা করা কি বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় ছিল? “বিজ্ঞান সেবক নয়, কল্পিত দেবীমূর্তির স্থাপনা যাদের উদ্দেশ্য তাঁরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটা আদৌ সম্ভব?” আপনি প্রশ্ন করেছেন। এমত প্রশ্নের অর্থ হল— আপনি জানেন না, বিজ্ঞানের যে কোনো প্রগতি বা আবিষ্কার বা সৃষ্টির প্রাথমিকতা হল কনসেপ্ট বা কল্পনা। কল্পনা pre-requisite. তা থেকেই শুরু হয় বিজ্ঞানসাধনা।

যাই হোক, দুঃখ পাবেন না। আপনারা মার্ক্সপুজো করুন। বাকদেবীর পূজা করে বিদ্যা ও বিজ্ঞানচর্চা করার জো আপনাদের নেই।

দেবযানী ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.