মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সৌজন্যে দু দুবার রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্যপদের সুযোগ হাতে এসেছিল ভারতের, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সে সুযোগ নষ্ট করেন। দুবারই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে হঠকারিতা দেখান শুধু নয়, উল্টে চিনের স্হায়ী সদস্যপদের জন্য নিজে চূড়ান্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং অন্যান্য দেশের সহযোগিতা-ভিক্ষায় নেমে পড়েন। এখন

রাষ্ট্রপুঞ্জে এখন যখন চিনের ভিটোয় জৈশ-এ-মহম্মদের মতো ভয়াবহ জঙ্গি সংগঠন ও মাসুদ আজহারের মতো জঙ্গিদের পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা ভারতের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না তখন ভারতের কূটনীতি নিয়ে স্বভাবতই নানা প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু উত্তর খুঁজতে হলে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ৭০ বছর পিছিয়ে গিয়ে জওহরলাল নেহরুর সেই হঠকারি সিদ্ধান্তের দিকে তাকাতে হবে, যার খেসারত কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতকে দিতে হচ্ছে। ১৯৫০ সালে প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ১৯৫৫ সালে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন দু দু বার ভারতকে স্হায়ী সদস্যপদের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু জওহরলাল নেহেরুর তা প্রত্যাখ্যান এবং প্রতিনিয়ত চিনের স্হায়ী সদস্যপদ পাওয়ার পক্ষে তাঁর অদম্য চেষ্টা বিশ্বের অঙ্গনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। অথচ ১৯৫৫ সালে সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে নেহেরু নির্দ্বিধায় বলে দেন যে, ভারতের কাছে স্হায়ী সদস্য পদের কোনও সুযোগ আসেনি।

কিন্তু ভারত যে দুবার এই সুযোগ পেয়েছিল তার তথ্য-প্রমাণের কোনও অভাব নেই।

১৯৫০ সালে মার্কিন প্রস্তাব ॥

১৯৫০ এর দশকে ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্য পদে চিনের জন্য আবেদন ও কূটনৈতিক প্রচার চালাতে থাকে তখন ওই সদস্য পদ তাইওয়ানের কাছে ছিল । ১৯৪৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ চিনের সদস্য পদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল । কিন্তু তার পর থেকেই জওহরলাল নেহরু নিজে চিনের জন্য নাগাড়ে চেষ্টা চালাতে থাকেন এবং কূটনৈতিক তদ্বিরে লেগে যান । ১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের রাষ্ট্রদূত ও নেহরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত এক চিঠিতে নেহরুকে জানান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের স্হায়ী সদস্য পদের জন্য প্রস্তাব রেখেছে ।

চিঠির নমুনা

কিন্তু উত্তরে জওহরলাল নেহেরু যা বলেন তা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। তিনি শুধু বিজয়লক্ষ্মীকে ওই প্রস্তাব খারিজ করতে বলেন তা নয়, বরং চিনের স্হায়ী সদস্য পদের জন্য ভারতের তরফে প্রস্তাব রাখতে ও চিনের পক্ষে অন্যান্য দেশের মত তৈরি করতে বলেন ।

নেহরুর চিঠির বয়ান

॥ ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রস্তাব ॥

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের লেখা ‘Biography of Nehru’ পুস্তকেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত রাশিয়া আরেকবার ভারতের স্হায়ী সদস্যপদের জন্য নেহরুর কাছে আবেদন রাখেন ।
Excerpts from Radhakrishman’s book
???

২০০২ সালে নেহেরুপন্থী ইতিহাসবিদ এ জি নুরানির পুস্তক Selected Works of Jawaharlal Nehru -তে পর্যন্ত ওই তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। নুরানি তদানীন্তন সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই বুলগানিন ও জওহরলাল নেহরুর এক কথোপকথনের সরাসরি উল্লেখ করেন । সেখানে বুলগানিন সরাসরি নেহরুর কাছে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্হায়ী সদস্যপদের প্রস্তাব রাখেন, কিন্তু আগের বারের মতোই নেহরু তা প্রত্যাখ্যান করেন ও চিনের সদস্যপদের জন্য বারংবার দাবি জানান।

Excerpts from Noorani’s book

এর থেকে পরিষ্কার হয় যে, নেহেরু দু’বার বিশ্বের দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে চিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ানোর ভুল নীতি নিয়ে চিনের কাছে ভালো হওয়ার বৃথা চেষ্টা করতে থাকেন এবং যার প্রথম নিদর্শন হিসাবে ১৯৬২ সালে চিন ভারত আক্রমণ করে এবং তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ক্রমাগত নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের সমস্ত হিতকারী সিদ্ধান্তকে নানাভাবে প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বাসঘাতকতা করতে আসছে। নেহরুর সেই ভ্রান্ত বিদেশীনীতি ও কূটনীতির বোঝা থেকে আজও আমরা রেহাই পাইনি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.