ভারতীয় হলুদের উপর শ্রীলঙ্কার নিষেধাজ্ঞা জারির​ কারন এবং তার প্রভাব

গত বছর ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় হলুদের উপর শ্রীলঙ্কার নিষেধাজ্ঞা জারি করাটাকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে দেখা হচ্ছে। পাটতলী মাক্কাল কাচ্চি (পিএমকে) কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত করার আগেই যেন তাঁরা কোনো পদক্ষেপ নিয়ে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সাহায্য করেন।

শ্রীলঙ্কা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই নিষেধাজ্ঞার​ ফলে ভারত “অত‍্যন্ত অসন্তুষ্ট” এবং কলম্বোর বন্দরে হলুদের প্রায় ৫০টি পাত্র আটকে রয়েছে। একটি রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে ভারত শ্রীলঙ্কার​ রাষ্ট্রপতি গোটাভায়া রাজাপাকসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তিনি তাঁর সেক্রেটারী পিবি জয়সুন্দরকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জানিয়েছেন।

“শ্রীলঙ্কা দেশীয় উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করার জন্য ভারতীয় হলুদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এরফলে বাজারে দাম বাড়তে শুরু করেছে। যদি এখানে হলুদ প্রতি কুইন্ট‍্যাল ৬০০০ টাকায় বিক্রি হয় তো ওখানে তার দাম গিয়ে দাঁড়িয়েছে​ প্রতি কেজিতে ৬০০টাকা”—বলেছেন আরকেভি রবিশঙ্কর, ইরোড টারমারিক মার্চেন্টস অ‍্যাসোসিয়েসেন এর সভাপতি।

অন্ধপ্রদেশের নিজামবাদের ব‍্যবসায়ী পুনম চাঁদ গুপ্তা জানিয়েছেন যে— “শ্রীলঙ্কায় হলুদ প্রতি কেজি ৮০০/৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে”।
ইরোড এবং নিজামাবাদ হলো ভারতীয় হলুদের প্রাথমিক​বাজার। শ্রীলঙ্কার রিপোর্ট বলছে যে রান্নার হলুদ সেখানে প্রতি কেজি ৩ হাজারেরও বেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা সরকার যদিও জানিয়েছেন যে হলুদের দাম প্রতি কেজি ৪ ডলার সত্ত্বেও, যা নির্ধারিত দামের থেকে অনেক বেশী। তবুও মশলার বাজারে এখনও কালোবাজারি দেখা যায়নি।

যদিও শ্রীলঙ্কা মরিচ, সরিষা, তেঁতুল, দারুচিনি, জায়ফল,গলা,এলাচ,আদা এবং লবঙ্গ আমদানী নিষিদ্ধ করেছে তবুও হলুদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির​ প্রভাব ই খুব খারাপ ভাবে পড়েছে।

রবিশঙ্কর জানিয়েছেন যে— আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর শ্রীলঙ্কায় হলুদের সহজলভ্যতা কমেছে। স্বাভাবিক ভাবেই অপ্রতুলতার​ জন্য দাম বেড়েছে।

শ্রী গুপ্তা বলেছেন যে— “প্রায় ৬০টি কন্টেনার কলম্বোয় ৬মাস ধরে পড়ে আছে”।

রাজাপকসের সরকার যদিও দাবি করেছেন যে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্যই​ তারা আমদানী নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না”।

লঙ্কার কৃষিমন্ত্রী রমেশ পাথিরানা বলেছেন যে দ্বীপ দেশটি প্রায় ৪০০০হাজার টন উৎপাদন করতে পারে যা স্থানীয় চাহিদার ৫০শতাংশের ও বেশী।

শ্রীলঙ্কার বানিজ্যে মন্ত্রী বান্দুলা গুনাওয়ার্দেনা জানিয়েছিলেন যে, রাজাপাকসের সরকার জনসাধারণের ব‍্যবহারের জন্য হলুদ আমদানী নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অনড় থাকবেন​ না। ব‍্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে পুনরায় রপ্তানীর বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবেন।

এই নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ করে এবং করে জারি করা হয়েছিল। অন‍্যদিকে পশ্চিম তীরের মাধ্যমে মশলা পাচারও শুরু হয়ে গেছে, যা মানে গিয়ে দাঁড়ায় যে এই পাচার প্রক্রিয়া ভারত থেকেই শুরু হয়েছে। এমনকি ভেজাল হলুদ গুড়োরও সন্ধান পাওয়া গেছে।

নিষেধাজ্ঞার​ বিষয় সম্পর্কে লঙ্কার মশলা প্রস্তুতকারকরা​ প্রধান ২টি বিষয় উল্লেখ করছেন।
প্রথমতঃ: কলোম্বোর উচিত ছিল এই নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগে উৎপাদনের জন্য কম করে দেড়বছর সময় দেওয়া।
দ্বিতীয়ত: তারা মনে করেন যে শ্রীলঙ্কায় উৎপাদন ব‍্যয় ভারতের তুলনায় অনেক বেশী।

লঙ্কার কৃষকরা তাদের বাড়ির উঠোনে খুব কম পরিমাণে হলুদ উৎপাদন করে যারফলে তাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে দাঁড়ায়। মশলার উৎপাদনকারীরা​ একমাত্র উপার্জনকারী।

ভারত শ্রীলঙ্কায়​ বছরে ৫হাজার টন হলুদ রপ্তানি করে।
রবিশঙ্কর জানিয়েছেন যে “লঙ্কায় মোট আমদানীর ৯০ শতাংশই ভারতীয় হলুদ।”

শ্রীলঙ্কার বাজার খুব ব‍্যয়বহুল এবং সে দেশের ক্রেতারা নিম্নমানের হলুদ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে না কারণ গুনমানের ব‍্যাপারে তাদের খুব একটা আপত্তি নেই। আরও জানা যায় যে মালয়েশিয়ায় বা ইন্দোনেশিয়ার হলুদের তুলনায় ভারতীয় হলুদ তার গন্ধ ও গুনমানের জন্য বেশি গ্ৰহনযোগ‍্যতা লাভ করে। ফলস্বরূপ, শ্রীলঙ্কার এই নিষেধাজ্ঞার​ প্রভাব ভারতীয় হলুদের দামের উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
রবিশঙ্কর বলেছিলেন যে “এইবছর আমাদের উৎপাদন কম, তাই খুব একটা প্রভাব পড়েনি”।

শ্রী গুপ্তা আরও যোগ করে বলেন যে— গত ৬/৭ মাসের মধ্যে হলুদের উপর নিষেধাজ্ঞার​ তেমন কোনও​ প্রভাব আমরা দেখিনি।

এরোডের সাধারণ বাজারে সবচেয়ে উন্নতমানের যে হলুদ পাওয়া যায় তা ৫৭০০টাকা প্রতি কুইন্ট‍্যাল এই হারেই লেনদেন হয় গত বছর যার দাম ছিল ৬৪০০টাকার আশেপাশে।

কৃষিমন্ত্রকের তৃতীয় অগ্ৰিম অনুমান অনুযায়ী ২০১৯-২০২০ সালে প্রায় ২.৫৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে হলুদ চাষ করা হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় ২.৩৩ লক্ষ হেক্টর বেশী। তবে এই একই বছরে উৎপাদন ৯.৪৬ লক্ষ ছিল, যেখানে আগের বছরের উৎপাদন হয়েছিল ৯.৬১ লক্ষ টন।

বিশেষজ্ঞরা এই নিষেধাজ্ঞার​ বিরুদ্ধে ওঠা আওয়াজকে “রাজনৈতিক চালাকি” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কারন এই বিষয়ে জড়িত টাকার পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন যে, এইসবকিছুর জন্য সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত​ হয়েছে শ্রীলঙ্কাবাসীরা।

https://ritamdigital.org/postview/d78c9cdc-a395-4dbc-921c-26971e508455

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.