পাকিস্তানের শান্তির বুলি শুধুই লোকদেখানো

পুলওয়ামার সন্ত্রাসবাদের ঘটনার পর খুব দ্রুতই পটপরিবর্তন হয়ে চলেছে। সি আর পি এফ কর্তারা একাশিটা বাসের এক কনভয়ে প্রায় আড়াই হাজার জওয়ানকে জম্মু থেকে শ্রীনগর পাঠাচ্ছিলেন। যদিও রাস্তাটা জাতীয় প্রধান সড়ক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গাড়ি ও ওই রাস্তায় সব সময় চলাচল করেছে, কিন্তু কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদীদের কথা মাথায় রাখেনি। বিশেষ করে পুলওয়ামা অঞ্চলটি জয়েশ সন্ত্রাসবাদীদের গড় হিসাবেই পরিচিত। কয়েকটি বিষয়ে আমাদের ব্যবস্থায় সুরক্ষার প্রয়োজন। যেমন কনভয় রওনা হওয়ার তারিখ, সময় গন্তব্যস্থল, কতজন যাবেন, কী ধরনের গাড়ি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ গোপনীয়তা রাখার প্রয়োজন ছিল। এক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদীরা সাত-আট দিনের সময় পেয়েছিল পরিকল্পনা করে প্রস্তুতি নেওয়ার। যেমন বিস্ফোরক বোঝাই একটা গাড়ি প্রস্তুত করা। সেই গাড়ি দিয়ে কনভয়ের একটা গাড়িতে ধাক্কা মারা। এই পদ্ধতিটাও প্রথমবার তারা প্রয়োগ করেছে। যদি রাস্তায় পথ-প্রহরী থাকতো, তাহলে তারা বাধাও দিতে পারত। অথবা গাড়িটিকে রাস্তার নিকটে আসতে বাধা দিতেও পারতো। এই আত্মঘাতী আক্রমণে সিআরপিএফ-এর ৪০ জন জওয়ান প্রাণ হারালেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদী ঘোষণা করেছিলেন, এই আক্রমণের চরম বদলা নেওয়া হবে। নেওয়াও হলো, কেউ জানতেও পারল না। পাকিস্তান জয়েশ জঙ্গিদের সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোট, চকোটি, মুজফ্ফরাবাদ অঞ্চলে যেখানে জয়েশের মূখ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে সেইসব তথ্য ছিল। ভারতের ১২টি মিরাজ বিমান রাত প্রায় তিনটের সময় উড়ে গেল। অধিকৃত ওই অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুড়িয়ে দিল। একজনও সাধারণ নাগরিক হতাহত হয়নি। বিমানগুলি নিরাপদে দেশের মাটিতে ফিরে এল মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে।

এই আক্রমণ এমন নিপুণতার সঙ্গে করা হলো, বিমান বাহিনীকে শত অভিনন্দন দিলেও কম হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, “ভারত আক্রমণ করলে প্রতি আক্রমণের চিন্তা করবো না, প্রতি আক্রমণ হবেই।” ভারতের আক্রমণে অন্তত ৩৫০ জন সন্ত্রাসবাদী ও তাদের প্রশিক্ষক, অন্য কর্মকর্তারা হতাহত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। মাসুদ আজহার বড়োমুখ করে ঘোষণা করেছিল জয়েশ-ই-মহম্মদ এই হামলা করেছে। একটাই চিন্তা তখন সমস্ত ভারতবাসীর মাথায় ঘুরছিল ‘কোথায়, কখন, কোন্‌পথে স্থলসেনা, নৌ-সেনা, বিমান হানা অথবা সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা আক্রমণটা হবে? ভারতের সমস্ত সুরক্ষা বাহিনী ভারতের সমস্ত সীমান্তে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছিল। আক্রমণটা অবশেষে এল বিমানবাহিনীর দ্বারা। লড়াকু বিমানগুলি ভারতের পুঞ্চ সীমান্তে আঘাত দেওয়ার জন্য বোমা রকেট ইত্যাদি নিয়ে সীমান্তের দিকে এগিয়ে এল। একটি এফ-১৬ বিমান ভারতের বিমান বাহিনীর অস্ত্রাঘাতে ভেঙে পড়ল। বিমানের পাইলট ও বিমানটি ভূপতিত হলো সীমান্তের অপর পারে। পাক রকেট অস্ত্রাঘাতে ভারতের একটি মিগ বিমানও ভেঙে পড়ল। পাইলট প্যারাসুটে নেমে পড়লেন। কিন্তু পড়লেন সীমান্তের অপর পারে। তিনি পাক সুরক্ষা কর্মীদের হাতে ধরা পড়লেন, যুদ্ধবন্দি হলেন। পাকিস্তানের বিমানগুলি তাদের অস্ত্রসম্ভার যত্রতত্র ফেলে পালিয়ে গেল। ভারতীয় বিমান বাহিনীর সামনে তারা দাঁড়াতে পারল না। তারা এসেছিল ভারতের ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার, ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার্স এবং অন্য অস্ত্র-উপকরণ, খাদ্য, পোশাকের ভাণ্ডার গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেনি। পালিয়ে বেঁচেছে। এফ-১৬ বিমানের কিছু টুকরো থেকে ওই বিমানটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। জানা যাচ্ছে ভারতের ভূপতিত মিগ বিমানের বৈমানিক উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান এফ-১৬ বিমানটিকে ভূপতিত করে পাকিস্তানের হাতে যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ-সহ অভিযোগ জানিয়েছে পাকিস্তান চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণে এফ-১৬ বিমান ব্যবহার করেছে।

এটা প্রমাণিত হয়েছে, অভিনন্দন কোনো প্রকার আক্রমণের জন্য আকাশে ওড়েননি। তিনি পাক বিমান বহরের আক্রমণ রুখতেই উড়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই ধরনের ঘটনায় যারা যুদ্ধবন্দি হয় তাদের ছেড়ে দেওয়াই প্রথা। কোনো যুদ্ধ হয়নি। ভারত কেবলমাত্র সন্ত্রাসবাদীদের নির্মূল করতেই বিমান আক্রমণ করেছিল, তাতে একজনও সাধারণ নাগরিক হতাহত হননি। বিশেষ করে জয়েশ-ই-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহার ঘোষণা করেছিল তার সংস্থাই পুলওয়ামার ঘটনা ঘটিয়েছে। পাকিস্তান এই আক্রমণের বিষয় চিন্তা করে, ধারণা করেছিল ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করে আবার সীমান্তের নিকটবর্তী সন্ত্রাসবাদীদের আস্তানাগুলি গুড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস করবে। সেজন্য তারা সমস্ত সন্ত্রাসবাদীদের সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মুজফ্ফরাবাদের বালাকোট, চকোতিতে যেখানে জয়েস-ই-মহম্মদের প্রধান প্রশিক্ষণ ঘাঁটি সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। তারা ভারতেই পারেনি, ভারত যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে (মিরাজ ২০০০) সুনিপুণ ভাবে ওই ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করে দেবে। হতাহতের সংখ্যা আনুমানিক। কিন্তু পাকিস্তান অভিযোগ করেছে ভারতীয় বিমান পাইন গাছের জঙ্গলের ভীষণ ক্ষতি করেছে। কিন্তু হতাহতের কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি। কিন্তু কৃত্রিম উপগ্রহ মারফত যে সব চিত্র পাওয়া গিয়েছে টেলিভিশনের মাধ্যমে সবাই তা প্রত্যক্ষ করেছেন।

এই বিষয়ে দুটি প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মাসুদ আজহারের দাবি জয়েশ-ই-মহম্মদ পুলওয়ামায় এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, যা প্রমাণ করছে জয়েশের সন্ত্রাসবাদীরা জম্মু কাশ্মীরে সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে, এবং দ্বিতীয়ত মাসুদ আজহার পাকিস্তানের এক হাসপাতালে থাকায় পাকিস্তান থেকেই ওই সন্ত্রাসের ঘটনার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং পরিচালনা করা হয়েছে। এর পিছনে পাক আই এস আই এবং সামরিক বাহিনী রয়েছে। যদি সত্যিই মাসুদ আজহার বিশেষ ভাবে অসুস্থ থাকে, তাহলে তার শ্যালক এবং ভ্রাতা ওই সন্ত্রাস পরিচালনা করেছে। সমস্ত বিশ্ব অকাট্য প্রমাণ পেয়ে গেল পাকিস্তানই সন্ত্রাসবাদের আঁতুড় ঘর। তাদের ভূমি থেকে, তাদের দ্বারাই আফগানিস্তান ও ভারতে সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১-র ঘটনারও প্রধান সাক্ষী। চীনও এবার কোনো প্রকারের বিরোধিতা না করে শান্তিপূর্ণ ভাবে সবকিছু মিটিয়ে নেওয়ার আবেদন করেছে। সমস্ত বিশ্ব এখন পাকিস্তানের বিপক্ষে। পাকিস্তানের ভূমি যে বহু বছর ধরে সন্ত্রাসীদের চয়ন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, বিস্ফোরক সরবরাহ করে চলেছে সে বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পাকিস্তানের বাঁধা বুলি পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের শিকার এবং যা কিছু ঘটছে তার জন্য দায়ী নন স্টেট অ্যাক্টরর্স’– আর ধোপে টিকবে না। ২৬/১১-র প্রধান হোতা লস্কর-ই-তৈবার হাফিজ সঈদের বিরুদ্ধেও ভারত অকাট্য প্রমাণ দিয়েছিল। আজমল কাসব ধরা পড়ে প্রকাশ্যে সব তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিল এবং পাক আই-এস-আই ও সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের কথাও প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পাক বিচারালয়ে বিচারের প্রহসন হয়েছিল। হাফিজ সঈদ এখন নিরপরাধ মানুষ হিসেবে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাকিস্তান বলছে, আরও অকাট্য প্রমাণ চাই। কোণঠাসা পাক প্রধানমন্ত্রী এখন ভারতকে বলছেন, পুলওয়ামা কাণ্ডের সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ দিলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। সেই সঙ্গে তিনি উইং কম্যান্ডার অভিনন্দনকে ভারতের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু ভারতের নীতি তিনি জানেন, পাকিস্তানের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদীদের জেলে পুরে তার যথাযোগ্য প্রমাণ দিলে তবেই আলোচনায় বসার কথা ভারত চিন্তা করবে। এই সময়ই ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স’-এর একটি আলোচনা সভা হয়ে গেল। ও আই সি এই প্রথমবার ওই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভারতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তার প্রতিবাদে পাকিস্তান ওই সভায় যোগদান করেনি। ভারতের তরফে ভারতের বিদেশমন্ত্রী শ্রীমতী সুষমা স্বরাজ ওই সভায় যোগদান করেন এবং বক্তব্য রাখেন। পাকিস্তানের জানা উচিত ছিল বিশ্বে মুসলমান সম্প্রদায়ের সব থেকে বেশি মানুষ ভারতে বাস করেন। ইন্দোনেশিয়ায় ভারত অপেক্ষা সামান্য কিছু বেশি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ হয়তো বসবাস করে থাকেন। সমস্ত ইসলামিক রাষ্ট্রও ভারতকে সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি কড়া ভাষায় পাকিস্তানের নিন্দা করেছেন এবং কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন।

এফ – ১৬ বিমান কোনো ভাবেই আক্রমণের জন্য ব্যবহার করা যাবে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিমান পাকিস্তানকে দেওয়ার সময়ই শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান ভারতের ব্যাটালিয়ন ও ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার্স এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্র-গোলাগুলির এবং খাদ্য-বস্ত্র- পোশাক ইত্যাদির ভাণ্ডার ধ্বংস করার জন্য বিমান আক্রমণে এফ – ১৬ বিমানও নিয়োগ করেছিল। একটি এফ-১৬ বিমান ভেঙে পড়ে। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রতিরোধে বাকি বিমান পালিয়ে বাঁচে। অভিনন্দনের মিগ বিমান এফ-১৬-কে ধ্বংস করেছে বলেই সংবাদ। কিন্তু অভিনন্দন পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়ে যান। তার উপর কী ধরনের অত্যাচার করা হয়েছিল জানা নেই। কিন্তু তার প্রত্যাবর্তনের সংবাদ প্রকাশ পেতেই এবং তিনি যে ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত দিয়েই ভারতে প্রবেশ করবেন শোনার পরই হাজার হাজার মানুষ তাকে সানন্দে গ্রহণ করার জন্য হাজির হয়েছিলেন। বেলা প্রায় ১২টার সময় তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ভারতের ‘বিমান অ্যাটচীর’ হাতে তাকে সমর্পণ করা হয়। প্রতীক্ষারত পুরুষ-মহিলারা জানতে পারেন তিনি সীমান্তের নিকটেই পৌঁছে গিয়েছেন। কিছু নিয়মানুসারে কাগজপত্রে তার হস্তাক্ষর হওয়ার পরই তিনি সীমান্ত পারাপারের জায়গায় পৌঁছে যাবেন। মহিলা, পুরুষ ঢোল বাজিয়ে নাচতে থাকেন, আর একটু পরেই তাদের প্রাণের অভিনন্দনকে সাদরে অভিনন্দন জানাতে পারবেন। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তারপর বিকেল গড়িয়ে রাতের আঁধার সবদিক ঢেকে দিল। মনে হলো, তাহলে কি শেষ মুহূর্তে তার প্রত্যার্পণ বিঘ্নিত হলো? হঠাৎ দেখা গেলে দূর থেকে অভিনন্দনের ঋজুদেহ পাকরেঞ্জার্সের সঙ্গে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে ভারতের দিকে। দুইজন বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল অভিনন্দন বর্তমানকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গেট খোলার পর পাক রেঞ্জার্সরা দাঁড়িয়ে গেল। অভিনন্দন ধীর পায়ে ভারতের মাটিতে পা রাখলেন। উদ্বেল জনতা, আনন্দে আত্মহারা হয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন— দের হ্যায়, দুরস্ত হ্যায়! আনন্দে তারা নেচে উঠলেন। সারা দিনের প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটল। পাকিস্তান কথা রেখেছে। রাত তখন সাড়ে নয়টা। পরে জানা গেল, পাকিস্তানের এক নাগরিক কোর্টে মামলা করেছেন, উইং কমান্ডার অভিনন্দনকে মুক্তি দেওয়া যাবে না কারণ তিনি পাকিস্তানের শত্রু, পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর বিমানকে আঘাত করেছেন। ইসলামাবাদের বিচারালয়ে সেই মামলার শুনানি চলছিল। শেষমেশ বিচারক মামলা খারিজ করে অভিনন্দের মুক্তির আদেশ বহাল রাখলেন। সমস্ত বিশ্ব এই প্রহসনের দিকে তাকিয়ে ছিল চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে পরামর্শ দিয়েছে, অভিনন্দনকে মুক্তি দাও, আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ মিটিয়ে নাও। কিন্তু ভারত সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল। পাকিস্তান তার ভূমি থেকে সন্ত্রাসবাদের সমস্ত অঙ্কুর নির্মূল করে ভারতকে প্রমাণ দিক ভারতের ভূখণ্ডে যত সন্ত্রাসবাদী রয়েছে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বিচার করে শাস্তি দিক তারপরই ভারত আলোচনার কথা ভাববে।

অভিনন্দন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলেন। তাঁকে দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। তার শারীরিক, মানসিক অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি নাকি বলেছেন, তাঁকে প্রায় ৬০ ঘণ্টা বন্দি রাখাকালীন তার উপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, অনেকবার তাকে জেরা করা হয়। তাকে রেডিয়ো, টিভি, সংবাদপত্র কিছুই দেখতে বা পড়তে দেওয়া হয়নি। এমনকী তার যে মুক্তির আদেশ হয়েছে, তাও তাঁকে জানানো হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন করছেন এ সবই তো প্রচলিত আইনের প্রতিকূল। শুধু এইটুকুই বলা যায়, পাক সামরিক বাহিনী সীমান্তে পদে পদে যে ব্যভিচারিতার নিদর্শন দিয়েছে, তাদের কাছে আর কিইবা আশা করা যায়! তবে এটুকুই শান্তি যে তারা জীবিত অবস্থায় অভিনন্দনকে ফেরত পাঠিয়েছে এবং সে পায়ে হেঁটে ভারতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রশ্ন থেকে যায়, এরপর পাক-ভারত সম্পর্ক কেমন থাকবে। যখন পাকিস্তান পুলওয়ামা ঘটাল এবং ভারত সন্ত্রাসবাদীদের ডেরায় বিমান হামলা করল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু সর্বক্ষণ পাক সামরিক বাহিনী সীমান্তে প্রচণ্ড গোলাগুলি চালিয়ে গেল। শুধু সীমান্তই নয়, আশেপাশের গ্রামেও তারা গোলার আঘাত করল। কিছু নিরাপরাধ মানুষ হতাহত হলেন। ভারত প্রত্যুত্তর দিতে বাধ্য হয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায় পাকিস্তানের শান্তির বাণী শুধুই লোক দেখান। বিশ্বকে শুধু জানানো যে পাকিস্তান কতটা শান্তির প্রয়াসী!

ভারতের পক্ষে এখন কোন পথে চলা উচিত? পাকিস্তান যাই বলুক সন্ত্রাসবাদ তারা চালিয়ে যাবে ভারতের বিপক্ষে, কারণ কাশ্মীর তাদের চাই-ই চাই। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে স্থল, জল এবং আকাশপথ এমন ভাবে নিশ্ছিদ্র প্রহরায় বেঁধে রাখতে হবে যাতে বাংলাদেশ, নেপাল, পশ্চিম সীমান্ত অথবা জম্মু-কাশ্মীর দিয়ে একটি মাছিও অনুপ্রবেশ করতে না পারে। ২৬/১১, পাঠানকোট, উরি ইত্যাদি জায়গায় সন্ত্রাসের ঘটনা পর্যালোচনা করলে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাই মনে আসছে। কাশ্মীর উপত্যকায় প্রতি তিনটি গ্রামের জন্য অন্তত একটি করে ব্যাটালিয়ন নিয়োগ করতে হবে। তারা শুধু যে সুরক্ষার জন্যই থাকবে তা নয়। গ্রামের বিপদ আপদ, ডাক্তার, ওষুধ খাদ্য সমস্যা, পরিবহণ সমস্যা অথবা বন্যা পরিস্থিতি সমস্ত বিষয়ে প্রকৃত হৃদয় দিয়ে তাদের সেবা করতে হবে। যাতে তারা সেনাবাহিনীর রাইফেলই দেখবে না, তাদের সেবার এবং ভালোবাসার মুখও যেন দেখতে পায়। এরফলে তারা যেমন সন্ত্রাসবাদীদের রক্তচক্ষুর ভয় থেকে নিস্তার পাবে, তেমনি সেনা বাহিনীকে ভালোবাসতে শিখবে। সন্ত্রাসবাদী অধ্যুষিত অঞ্চলে এটাই একমাত্র প্রতিষেধক। আমি ভারতের সমস্ত সন্ত্রাসবাদী অধ্যুষিত অঞ্চলে এবং শ্রীলঙ্কায় এই স্ট্র্যাটেজি প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছি। নাগাল্যান্ড, মণিপুরে শান্তি এসেছে, পঞ্জাবে শান্তি এসেছে, শ্রীলঙ্কায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। কোনো সন্দেহ নেই কাশ্মীরে এই স্ট্র্যাটেজি বিফল হবে না। ভারত বিরোধী সমস্ত দল ও ব্যক্তিকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং যারা ভারতীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে তাদেরও কোনোভাবে নরম হাতে প্রতিরোধ করার প্রচেষ্টা ভুলতে হবে। যদি কোনো মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তোলেন, তাদেরও বুঝিয়ে দিতে হবে সেনাদেরও মানবাধিকার আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও বুঝতে হবে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাহলেই কাশ্মীরের বাইরের সন্ত্রাসবাদী এবং ভিতরের দেশদ্রোহীদের সম্যক মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

মেজর জেনারেল কে কে গঙ্গোপাধ্যায় (অ:ব: প্রাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.