কাশ্মীরের পুলওয়ামায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের ওপর পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিদের হামলার ঘটনায় সমগ্র বিশ্ব শােকে নির্বাক হয়েছে। এহেন কাপুরুষােচিত এবং বর্বরােচিত হামলার ঘটনার নিন্দা করার ভাষাও কারাে নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিমধ্যেই আওয়াজ উঠেছে— পাকিস্তানকে এবার সমুচিত শিক্ষা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মােদীও দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, আপনাদের বুকে যে আগুন জ্বলছে, সেই আগুন আমার বুকেও জ্বলছে। পাকিস্তানকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পুলওয়ামার ওই জঙ্গি হামলার পর এই আবহে দেশের বিরােধী রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা কেমন? এই ঘটনার পর বিরােধী রাজনৈতিক দলের নেতারা শােক প্রকাশ করেছেন। না করে অবশ্য তাদের উপায় ও ছিল না। এমনিতেই তাদের বিশ্বাসযােগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে, তাদের দেশপ্রেম নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ রয়েছে। ফলে, এখন অন্য কোনােরকম আচরণ করলে দেশের মানুষ পুরােপুরি তাদের বর্জন করত একথা বেশ ভালােভাবেই বােঝেন বিরােধী দলের নেতৃবৃন্দ। অতএব, শােক প্রকাশ করে দায় সেরেছেন তারা। তবে, কয়লার ময়লা ধুলেও যায় না। কাজেই বিরােধীরা প্রাথমিক ভাবে শােকপ্রকাশ করলেও, এই জঙ্গি হানার ঘটনার তিনদিনের মাথাতেই তারা তাদের প্রকৃত পরিচয় চিনিয়ে দিয়েছে। জঙ্গি হানার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদলীয় বৈঠকে যখন কেন্দ্রীয় সরকার প্রস্তাব এনেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দেওয়ার, তখন কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং বামপন্থীরা সেই প্রস্তাবের বিরােধিতা করেছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কেন্দ্র সরকার কোনাে রকম কড়া পদক্ষেপ করুক তা তাদের না-পসন্দ। যদিও ওই বৈঠকে বিজু জনতা দল এবং শিবসেনা কেন্দ্রের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। ওই সর্বদলীয় বৈঠকেই বিরােধী দলের নেতারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের মনােভাব কতখানি নরম। সমগ্র দেশ যখন পাকিস্তানকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার দাবি করছে, তখনও দেশবাসীর এই আবেগকে অগ্রাহ্য করেই এই বিরােধী নেতারা পাক প্রেমে নিমজ্জিত থাকাকেই বেশি শ্রেয় মনে করেছেন। এদের এই মানসিকতাই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গত সাত দশকে বিশ্বের সামনে ভারতকে এক কাপুরুষ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এদের এই মানসিকতার জন্যই পাকিস্তান এবং চীনের মতাে শত্রুরাষ্ট্র ভারতের ভূমি দখল করার অপপ্রয়াস চালাতে সাহস পেয়েছে। এদের পাকিস্তান প্রেমের কারণেই ভারতের ভিতর পাক মদতপুষ্টজঙ্গিরা স্বচ্ছন্দে নিজেদের জাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

কংগ্রেস, সিপিএম-সহ এই বিরােধীদের পাকিস্তানও তার স্বাভাবিক মিত্ৰই মনে করেছে। যে কারণে পাক রাজনীতিকরা খােলাখুলিই প্রকাশ্যে ২০১৯-এর লােকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে জেতানাের জন্য আবেদন করেছেন। প্রত্যুত্তরে, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী আগাম জানিয়ে রেখেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানকে বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হবে। এরও আগে রাহুল গান্ধী সহ কংগ্রেস নেতারা নয়া দিল্লিতে পাক রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে গােপন বৈঠক করেছিলেন কংগ্রেস নেতা মণিশংকর আইয়ারের বাড়িতে। এই মণিশংকর আইয়ার পাকিস্তানে গিয়ে ভারতের নিন্দা করে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সফাই গেয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন। পুলওয়ামার ঘটনার পর কংগ্রেস নেতা নভজ্যোত সিং সিধু প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সাফাই গেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। সিধুর বিরুদ্ধে কংগ্রেস এখনাে পর্যন্ত কোনাে ব্যবস্থা নিয়েছে বলে শােনা পায়নি। কংগ্রেসের পাকিস্তান প্রেম অবশ্য নতুন কিছু নয়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে মহম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তান ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও মােহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতের রাজকোষ থেকে সেই পাকিস্তানকে ৫০ কোটি টাকা দান করার দাবিতে অনশনে বসেছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহতি পরেই পাক সেনারা যখন অন্যায় ভাবে কাশ্মীরের একটি অংশ দখল করে, তখন সেই দখলদারি পাক বাহিনীকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে দিতে উদ্যত হলে, কোনাে এক রহস্যজনক কারণে জওহরলাল নেহরু ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সরে আসার নির্দেশ দেন। সেই থেকে দীর্ঘ সাত দশক ওই ভুখণ্ড পাক অধিকৃত কাশ্মীর হয়েই রয়েছে। এর চেয়ে স্বাভাবিক মিত্র সারা বিশ্ব ঘুরেও পাকিস্তান আর কোথায় পাবে? পাকিস্তান এবং কংগ্রেস দুতরফেরই একটিই উদ্দেশ্য—তা হলাে, দিল্লি থেকে নরেন্দ্র মােদীকে সরাও। পাকিস্তান নরেন্দ্র মােদীকে সরাতে চাইছে। তার কারণ, গত চারবছরে নরেন্দ্র মােদী প্রমাণ করেছেন ভারতও শত্রুকে শায়েস্তা করার হিম্মত রাখে। নরেন্দ্র মােদীর সময়েই চীনের সঙ্গে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে ভারত। কাজেই ক্ষমতায় মােদী থাকলে সমূহ বিপদ। ভারতের ভিতর জঙ্গি জাল বিস্তারের পুরাে পাকিস্তানি ছকটাই বানচাল হয়ে যাবে তখন। অন্য দিকে কংগ্রেস। কংগ্রেস নরেন্দ্র মােদীকে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে দিতে চায় না একটিই কারণে। কংগ্রেস জানে নরেন্দ্র মােদী পুনরায় ফিরে এলে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত গান্ধী পরিবার এবং তার বশংবদদের দেশকে লুট করে খাওয়ার বন্দোবস্ত চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

কংগ্রেসের মতােই সম পরিমাণে পাকিস্তান প্রেম রয়েছে বামপন্থীদের হৃদয়েও। দেশভাগ পর্ব থেকেই সেই পাকিস্তান প্রেমের পরিচয় বারে বারেই দিয়ে গেছে বামপন্থীরা। দেশভাগ পর্বে এই বামপন্থীরাই আওয়াজ তুলেছিল— আগে পাকিস্তান দিতে হবে, পরে ভারত স্বাধীন হবে। অবশ্য এরা চীন প্রেমও কিছু কম দেখায়নি। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধে এই চীনাপন্থী বামপন্থীরাই ভারতকে ‘আক্রমণকারী’ আখ্যা দিয়েছিল। এবারও পুলওয়ামায় নৃশংস জঙ্গি হামলার পর সিপিএম এবং সিপিআই— এই দুই বামপন্থী দলের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, কোনাে মতেই পাকিস্তানের ওপর প্রত্যাঘাত করা চলবে না। তদুপরি, সিপিএমের দৈনিক মুখপত্র ‘গণশক্তি’তে লেখা হয়েছে ‘যুদ্ধের জিগির তুলে ভােটে জেতার চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মােদী’। এই একটি লেখাতেই প্রকাশ, এরকম একটি ঘৃণ্য জঙ্গি হামলা থেকে কী সুকৌশলে এবং মিথ্যা প্রচারে দেশবাসীর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে চাইছে বামপন্থীরা।

প্রত্যক্ষ এবং পরােক্ষভাবে বামপন্থীরা বরাবরই পাকিস্তান এবং পাকপন্থী জঙ্গিদের যে মদত দিয়ে যাচ্ছে, তার নানাবিধ প্রমাণও ইতিউতি ছড়িয়ে আছে। যেমন, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্ররা আওয়াজ তুলেছিল ভারত তেরে টুকরে হােঙ্গে, ইনশাল্লাহ, ইনশাল্লাহ। কাশ্মীরি জঙ্গি আফজল গুরুর ফাঁসির পর এরাই আফজলের ছবি নিয়ে শােকমিছিল করেছিল। এদের পাশে এসে তখন দাঁড়িয়েছিলেন, সিপিআই-সিপিএম নেতারা।

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও অবশ্য এসেছিলেন। তখন কেউ প্রশ্ন তােলেননি, ‘ভারত তেরে টুকরে হােঙ্গে’ এই স্লোগান যারা দিচ্ছে, তারা কারা? বামপন্থীদের নতুন আইকন কানহাইয়া কুমার প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, যারা স্কুলে ক্লাস টেনের গণ্ডি ডিঙোতে পারে না, তারাই জওয়ান হয়। যে জওয়ানরা নিজের জীবন বিপন্ন করে সীমান্তে দেশ পাহারায় নিযুক্ত, তাদের সম্বন্ধে এত ঘৃণ্য মন্তব্য ইতিপূর্বে কেউ করেনি। ভবিষ্যতেও কেউ করবে বলে মনে হয়।

তবে সব থেকে সরেস পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুসলমান তােষণের রাজনীতি এখন সর্বজনবিদিত। এত নগ্ন ন্যাক্কারজনক তােষণের উদাহরণ এর পূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। সে নিয়ে আর বিশদ আলােচনা করে লাভ নেই। এহেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার পুলওয়ামার হামলার পর তার বিবৃতিতে বললেন, কোনাে তদন্ত না করেই পাকিস্তানকে দোষারােপ করা ঠিক নয়। হুবহু প্রায় একই কথা বলেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কীসের তদন্ত আর কীসের প্রমাণ চান মমতা আর ইমরানের মতাে রাজনীতিকরা ? পুলওয়ামার হামলার দায় স্বীকার করেছে জয়েশ-ই-মহম্মদের মতাে জঙ্গি সংগঠন। ওই সংগঠনের নেতা মাসুদ আজহার নিশ্চিন্তে পাকিস্তানের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে। এবং সমগ্র বিশ্ব জানে জয়েশ-ই-মহম্মদ নামক এই সংগঠনটি পাক সেনাবাহিনীর মদতপুষ্ট। তার পরও মমতা আর ইমরান কী প্রমাণ চাইছেন? কোন সত্যকে আড়াল করতে চাইছেন ওরা।

পুলওয়ামার এই জঙ্গিহানার পর সারা দেশ যখন ক্ষোভে উত্তাল, দিকে দিকে মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত ক্ষোভের প্রকাশ দেখা দিচ্ছে, তখন মমতা বলে বসলেন, আর এস এস এবং বিজেপি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রীকে সবিনয়ে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, ২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনকে বিতাড়নের দাবিতে পাকসার্কাসে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ব্যক্তিটি এখন তার দলের সংসদ সদস্য। নিষিদ্ধ ঘােষিত জঙ্গি সংগঠন সিমি-র এক নেতাকে তিনিই রাজ্যসভায় তার দলের সাংসদ হিসাবে পাঠিয়েছেন। ২০১১ সালে দেগঙ্গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল পাণ্ডাটি ছিল তারই দলের সংসদ সদস্য। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নালিয়াখালিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারই মন্ত্রীসভার এক সদস্য। ধর্মতলায় পুলিশ পিটিয়েছিল যে সংখ্যালঘু সংগঠনের সদস্যরা, তাদের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রীসভার সদস্য। কে কোন উদ্দেশ্যে কাকে আড়াল করতে চাইছেন তা দেশবাসীর কাছে কিন্তু পরিষ্কার।

আসলে ভারতের লড়াইটা দুতরফে। ঘরে এবং ঘরের বাইরে। পাকিস্তান বহিঃশত্রু। তাকে চিনে নেওয়া সহজ। কিন্তু ঘরের ভিতরের শত্রুরা? লড়াইটা তাদের বিরুদ্ধেও জোরদার চালাতে হবে ভারতকে।

রন্তিদেব সেনগুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.