সুদূর অতীত থেকেই পৃথিবীব্যাপী মুখোশের প্রচলন দেখা যায়। মানুষের ব্যক্তি চরিত্রকে অন্য এক সত্ত্বায় রূপ দেয় মুখোশ। আদিম সমাজে অশরীরী আধিভৌতিক জগতের সঙ্গে ব্যক্তির সংযোগ ঘটাতে মুখোশের ব্যবহার হতো। প্রচলিত আছে ঈশ্বর, জীবিত এবং মৃত মানুষের যোগসূত্র ঘটাতে মুখোশ রহস্য ও গুপ্তবিদ্যার হাতিয়ার। আদিকাল থেকেই ধর্মীয় রীতি, উৎসব, পার্বন থেকে শুরু করে আত্মরক্ষায় মুখোশের ব্যবহার করা হত।

কুসমণ্ডির মহিষবাথান, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এক শান্ত সবুজ গ্রাম। গ্রাম বলতেই যে দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত, নীল আকাশ, আকা বাঁকা নদী, নিকানো উঠোনের কথা মনে পড়ে, ঠিক তেমনই একটি গ্রাম মহিষবাথান।

মহিষবাথান ও তৎসংলগ্ন এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের প্রাচীন লোকশিল্প গোমিরা নাচ বা মুখা খেল। গ্রামীণ দেবী গ্রাম চন্ডীর আরাধনায় স্থানীয় রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মানুষ মুখোশ পরে এই নাচ করেন। রঙে, ভাস্কর্যে, শৈল্পিক গুণে আফ্রিকার প্রাচীন মুখোশকে মনে করায় কাঠের তৈরি এই মুখোশ, স্থানীয় নাম মুখা। তবে অন্যান্য অনেক প্রাচীন শিল্পের মতোই হারিয়ে যেতে বসেছে মুখাও।

কোচবিহারের শীতলপাটি আর দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমুন্ডির কাঠের মুখোশ। বহু চর্চিত এই দুই হস্তশিল্প প্রায় সকলেরই জানা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখোশ নাচ এবং স্থানীয় স্তরেই ব্যবহৃত হত এই মুখোশ। ফলে রোজগার তেমন ছিল না বললেই চলে।

রাজবংশী, রাভা ও মেচ সম্প্রদায়ের মুখোশ শিল্পীরা মুখোশ বানায় ৷ কাঠের উপরে বাটালির ঘায়ে ফুটিয়ে তোলা হয় ডাকিনী, অসুর, চোরচুন্নি, সং, কালীর মুখোশ৷ মুখোশ শিল্প মানেই পালাগান৷ উত্তরবঙ্গের পালাগানে মুখোশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ কাঠের ওই মুখোশ পরে শিল্পীরা এক সময় পালাগান করতেন৷ রাতভর চলত চোরচুন্নির পালা, গম্ভীরা, গুমরিমতি পালা৷ শিল্পীরা মুখোশ পড়ে আসতেন মঞ্চে৷ যাঁর মুখোশ যতটা জমকালো, সেই শিল্পীরও ততটাই
কদর৷

আধুনিক সংস্কৃতির তাণ্ডবে উত্তরের পালাগান হারাতে বসেছে৷ পালাগানের জনপ্রিয়তা কমার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে মুখোশ শিল্পও৷

গম্ভীরা পূজা কেন্দ্রীক গম্ভীরায় মুখোশ নৃত্য স্থানীয় ভাষায় ‘মুখা নাচ’ ও গান বর্তমান। তন্মধ্যে গম্ভীরা মুখোশ নৃত্যই প্রাচীনতম। গম্ভীরা মুখোশনৃত্য ;তান্ত্রিক ও ঐন্দ্রজালিক এই নৃত্য গম্ভীরা পূজার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজরিত। আদিতে নিম ও ডুমুর কাঠ দিয়েই এই সব মুখোশ তৈরী হত। ধর্মীয় আচার যুক্ত এই সব মুখোশ নির্মিতি এবং তার সংরক্ষণ পদ্ধতি রয়েছে।
মুখোশ নাচ বা মুখা নাচ এ মূলত কাঠের মুখোশ-ই ব্যবহৃত হয়।

নৃত্যমণ্ডপ’ও সাজসজ্জার স্বাতন্ত্র্যের উল্লেখ করেছেন নৃত্য মন্ডপের যে অংশে নৃত্যগীত অনুষ্ঠিত হয় সেখান কোনপ্রকার আসনের ব্যবস্থা থাকে না __ অতএব সেখানে যারা অনুষ্ঠান করে তাদের ধুলোর উপরেই নাচ -গান করতে হয়। এই নাচগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং এখনও সেই জনপ্রিয়তা আছে। একই দিনে এবং একই সময়ে বিভিন্ন গম্ভীরায় মুখানাচের অনুষ্ঠান হলে সমৃদ্ধ নৃত্যানুষ্ঠানগুলি সকলেই উপভোগ করতে পারবেন না জেনে এবং কুশলী নর্তকগণের অভাব হয় বলে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে গম্ভীরা অনুষ্ঠান ও নাচ হয়ে থাকে। মন্ডপে রঙিন কাগজের পদ্মফুল দিয়ে সাজসজ্জার ব্যবস্থা করা হত। গম্ভীরা থেকে গাম্ভিরান্তরে যাওয়ার জন্য অনেকগুলি পাটকাঠির গোছা একত্র করে জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হত , এগুলিকে ‘উকা ‘ বলা হয়।

গম্ভীরা অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে ছোট তামাশায় ‘ভক্তগড়া’এবং ‘শিবগড়া’ অনুষ্ঠানাদির পর রাত্রিকালে বিবিধ নাচ -গান ও মুখ্যার নাচ হয়। আগে নাচের সময় দর্শকবৃন্দের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য পিচকিরি দিয়ে গোলাপজল দেওয়া হত। কোনও কোনও সময় রং মশালেরও ব্যবস্থা থাকত।

গম্ভীরা অনুষ্ঠানে বড় তামাসা ,কালিঘাটের নীল পুজোর দিনে গাজনের সময় সন্ন্যাসীরা যেমন শোভাযাত্রা করে থাকেন ,এখানেও অনুরূপ আট থেকে আশি সকলেই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। ভূত -প্রেত -প্রেতিনী ,বাজিকর -বাজিকর-স্ত্রী ,সাঁওতাল ,তুবড়িওয়ালা ইত্যাদি যার যেমন ইচ্ছা সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে এক গম্ভীরা থেকে আর এক গম্ভীরায় যায়।

এই অনুষ্ঠানটি সাধারনত দিনের বেলায় হয়ে থাকে। বিগত ষাটের দশকেও দেখা গেছে ,রাত্রে হনুমান মুখা নামে বিশেষ আকর্ষনীয় এক নাচ, হনুমানের সমুদ্র পার ও লঙ্কা দহনের ঘটনা যাতে অভিনয় করে দেখানো হত। ওইদিন খুব সকালে সূর্যদয়ের আগে মশাল গম্ভীরা’র জনপ্রিয়তা আজও রয়েছে।

সাধারণত গোমিরা নাচ বা গম্ভীরা নাচ ও পালা রামায়ন কেন্দ্রীক হয়। এর জন্য রাম, রাবন, সীতা, রাক্ষস, হনুমান সব মুখোশ আলাদা ভাবে তৈরি হয়। নাচের শুরুতে থাকে গল্পকার বুড়ো বুড়ির চরিত্র। এক্ষেত্রে বুড়ো বুড়ি মানে শিব পার্বতীকে বোঝানো হয়।

কাঠের মুখোশ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় কাঠের মধ্যে নিম কাঠ’ই ব্যবহৃত হয়। নিম ছাড়া অন্য কাঠের মধ্যে শুধু বেল কাঠের ব্যবহার দেখা যায়। এই দুই ধরনের কাঠ ব্যবহারের নেপথ্যে দুটি কারণ বর্তমান ;যথা :- ১ বিশ্বাস ও সংস্কার অনুসারে নিম ও বেল কাঠ শুদ্ধ ,পবিত্র ও দেবতাদির অর্চনায় সুপ্রচলিত ; এবং
২ নিমকাঠ দীর্ঘকাল টেঁকে। এর আঁশ বেশ শক্ত,তাছাড়া নিমকাঠে কখনও ঘুণ ধরার ভয় থাকে না।

এছাড়া গামার ও ছাতিম কাঠ ব্যবহৃত হয়। এসব কাঠ ওজনে হালকা তাই সহজে ফেটে যায় না। এছাড়া শিমুল, শিশু, আমি, জাম কাঠেও মুখোশ তৈরি হয়।
মুখোশ তৈরির জন্য প্রথমে ৫০ সেমি লম্বা ও ৯০ সেমি পরিধিবিশিষ্ট কাঠের খণ্ড নিতে হয়। তারপর ওই কাঠখণ্ডকে লম্বালম্বি চেরাই করে দু’খণ্ড করে দুটো মুখোশ তৈরি করা হয়। মুখোশ তৈরির জন্য কাঁচা কাঠেই ব্যবহার করতে হয়।

চেরাই করার পর তুলনামূলকভাবে উত্তল বাইরের অংশেই খোদাই কাজটা আগে করা হয়। কান, নাক, দাঁত সব আগে বার করে নেওয়া হয়। বিভিন্ন আকারের বাটালির সাহায্যেই এই কাজ করা হয়।

পর্যায়ক্রমে সব কাজ হয়ে গেলে তিনটি ফুটো করা হয় বাঁধার জন্য- দুটো দুই কানের পাশে এবং একটি ওপরের মাঝামাঝি অংশে।

এছাড়া মুখোশবিশেষে দুই চোখের নিচে বা নাচের সময় শিল্পী দেখতে পান এবং নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারেন।
এরপর রং করার আগে মসৃণ করার জন্য শিরিষ কাগজ ব্যবহার করা হয়। বাইরের খোদাই কাজের পর ভিতরের কাঠ গোলাই বাটালি দিয়ে বার অংশেই তারপিন মেশানো তেল রং লাগানো হয়।

রং সাধারণত এখনো অবধি ভেষজ ব্যবহার করা হয়। যেমন- নীল রঙ এর জন্য অপরাজিতা ফুল ব্যবহার করা হয়, সবুজ রঙের জন্য কুন্ডরি গাছের পাতা ব্যবহার করা হয়, হলুদের জন্য কাঁচা হলুদ, কালো রঙের জন্য ভূষ কালি, সাদা রঙের জন্য সাদা পাথর ব্যবহার হয়, লালা রঙের জন্য খয়ের, গামার ইত্যাদি গাছের ছাল ব্যবহৃত হয়। রং এখনো অধিকাংশ শিল্পী রোদে ফেলে শুকায়।

মহাদেবের অপর নাম গম্ভীর। মধ্যযুগে গম্ভীরা বলতে বিশেষ ভাবে শিবের মন্দির বুঝানো হতো। কিন্তু বাস্তবে গম্ভীরা নামক কোনো মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো পূজা ও উৎসবের আয়োজন করা হতো না। বহু আগে থেকে উত্তরবঙ্গে চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়কপূজা, শিবের নৃত্য ইত্যাদির প্রচলন ছিল। এই কারণে উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও শিবকে গম্ভীরা বলা হতো। এই শিবের গাজনের (গাজন: ধর্মমঙ্গলের কাহিনী থেকে জানা যায় রানী রঞ্জাবতী ধর্মকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে গাজন উৎসবের প্রচলন করেন)।

কোচ, রাজবংশী, পলিয়া এবং মাহালী , হাঁড়ি, বাগদী, কেওট, নুনীয়া, চামার, পোদ নাগর, ধানুক চাঁই, তুড়ী ইত্যাদি সম্পদায়ও এই পূজা করতো। এই সূত্রে যে গীত রচিত এবং পরিবেশিত হতো, তাই কালক্রমে গম্ভীরা নামে পরিচিতি লাভ করেছিল।

বিহারে গাওহার বৃক্ষ, উত্তরবঙ্গে গাম্ভীর নামে অভিহিত হয়। শিবপূজায় এই কাঠের পিঁড়ি ব্যবহৃত হতো। সেখান থেকে গম্ভীরা নামটি এসেছে এমনটা কেউ কেউ দাবি করেন।

বয়োঃজেষ্ঠ শিল্পীরা নবীনদের কাজ শেখান, প্রথমে পালিশ বা ছোট খাটো খোদাইয়ের কাজ দেওয়া হয়, দক্ষতা বৃদ্ধির পর পুরো একটি মুখোশ তৈরির দায়িত্ব পান শিল্পী। কাঠ ও অন্যান্য কাঁচামাল সমিতির তরফ থেকেই সরবরাহ করা হয়। শিল্পীরা সমিতিতে এসে কাজ করেন, বিক্রির ব্যবস্থাও করে সমিতিই। কাঠ ছাড়াও তৈরি হয় বাঁশের মুখোশ।

এ তো বাপঠাকুর্দার শিল্প, ও কুসমণ্ডির মানুষের ভেতরেই আছে, ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হয়, এখনকার ছেলেপুলে যারা আসে তারাও ছোট থেকেই মুখা খেল দেখে, শুধু ওদের বানানোর কায়দাটা দেখিয়ে দেয়, মাপজোকের ব্যাপারটা শিখিয়ে দেয়, বাকি ওরা নিজেরাই বুঝে যায়।

দুর্গেশনন্দিনী

তথ্যঃ বাংলার লোকশিল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.