কাশফুল, নীল আকাশ আর মণ্ডপে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠের সুরে শারদোৎসবের আমেজ। উমার আগমনে উৎসবমুখর সল্টলেকের ‘মৌ-এর দুর্গাবাড়ি’। গত বছর যে ঐতিহ্যের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল, এ বার তা দ্বিতীয় বছরে পা দিল। আড়ম্বর ও শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন রায়চৌধুরী পরিবারের সমৃদ্ধ ইতিহাস। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাংলার সংস্কৃতির মেলবন্ধনে সেজে উঠেছে এই দুর্গোৎসব।
এই কাহিনির সূত্রপাত আঠারো শতকের গোড়ায়, হুগলির শান্ত গুড়বাড়ি গ্রামে। সুবিশাল আমবাগান, দিঘি এবং সাবেক ভিটেবাড়িকে ঘিরে তখন রায়চৌধুরী পরিবারের সমৃদ্ধি। পরিবারের দুর্গাদালান মুখর হয়ে উঠত শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ঢাকের আওয়াজে। অতিথি-অভ্যাগতদের আপ্যায়ন এবং রাজকীয় নিষ্ঠায় পালিত হত দুর্গাপুজো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারটি দুটি শরিকি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। রামনারায়ণ রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘বড়বাড়ি’ পরিচিত হয় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ জিউয়ের নামে। অন্য দিকে, ইন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘ছোটবাড়ি’ পরিচিতি পায় শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ জিউয়ের নামে।
রায়চৌধুরী পরিবারের প্রবীণদের মুখে মুখে আজও প্রচলিত রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি। কথিত আছে, বড়বাড়ির কর্তা রামনারায়ণ রায়চৌধুরী এক রাতে স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে তিনি দেখেন, কলকাতার জগন্নাথ ঘাটের কাছে গঙ্গার পাড়ে পড়ে রয়েছে একটি বিশেষ পাথর। সেই স্বপ্নের নির্দেশ মেনে ঘাটে গিয়ে তিনি একটি বিরল কষ্টিপাথর উদ্ধার করেন। পাথরটির গায়ে খোদাই করা ছিল শ্রীকৃষ্ণের অপূর্ব অবয়ব।
এর পর বেনারসের প্রখ্যাত কারিগরদের নিয়ে এসে সেই পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয় রাধাগোবিন্দ জিউয়ের বিগ্রহ। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করা হয় রাধারানীর একটি অষ্টধাতুর মূর্তি। সেই সময় থেকেই রায়চৌধুরী পরিবারের নিত্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে ওঠেন রাধাগোবিন্দ জিউ।
তবে পারিবারিক শাস্ত্রীয় রীতি মেনে রাধাগোবিন্দ জিউয়ের সেবা শুরু হওয়ার পর প্রায় আড়াইশো বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের দুর্গোৎসব। সময়ের প্রবাহে বহু পরিবর্তন এলেও পূর্বপুরুষদের সেই পুজো পুনরায় শুরু করার আকাঙ্ক্ষা পরিবারের বংশধরদের মনে থেকে গিয়েছিল। এরই মধ্যে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুরি হয়ে যায় পরিবারের ঐতিহ্যবাহী অষ্টধাতুর রাধারানী মূর্তি। পরে ধনেখালি থানার মাধ্যমে ভগ্নাবস্থায় মূর্তিটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দুর্গাপুজোর স্মৃতি ও আক্ষেপ রয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের মনে।
সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সত্যম রায়চৌধুরী। সল্টলেকে তাঁর বাসভবন ‘মৌ-এর দুর্গাবাড়ি’র ঠাকুরদালানে ফের শুরু হয় মাতৃআরাধনা। এই পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক আন্তরিক প্রয়াস।
এ বার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার সুমধুর কণ্ঠে উৎসবের সূচনা হয়। শারদোৎসবের প্রতিটি দিনই সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠছে ঠাকুরদালান। অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন অভিজিৎ আচার্য, সৌম্য বসু, জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘সারেগামাপা’-র তরুণ তারকারা এবং সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী।
ইতিহাসের শিকড়, পারিবারিক ভক্তি এবং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— এই তিনের মেলবন্ধনেই স্বতন্ত্র পরিচিতি পেয়েছে সল্টলেকের ‘মৌ-এর দুর্গাবাড়ি’। দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করে এই পুজো যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করছে। হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগে দুর্গোৎসব পেয়েছে এক বিশেষ আবেগময় মাত্রা।

