আয়ুষ্মান ভারত ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনায় অনিয়মের অভিযোগ, দরপত্র থেকে বাদ দুই টিপিএ সংস্থা

আয়ুষ্মান ভারত ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনায় অনিয়মের অভিযোগ, দরপত্র থেকে বাদ দুই টিপিএ সংস্থা

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ভুয়ো বিল তৈরি এবং অনিয়মে মদত দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একাধিক নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষের প্রশাসনিক সংস্থা বা ‘থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ (টিপিএ)-এর সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল বার বার। এত দিন একাধিক নির্দেশিকা জারি করে অনিয়ম রোখার চেষ্টা হলেও অভিযুক্ত কোনও টিপিএ সংস্থাকে সরিয়ে দেওয়ার নজির ছিল না। এ বার আয়ুষ্মান ভারত এবং মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার ক্ষেত্রে কড়া পদক্ষেপ করল স্বাস্থ্য ভবন। গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে দরপত্রের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে দুই সংস্থা— ‘মেডি অ্যাসিস্ট হেলথ ইনসিওরেন্স’ এবং ‘ভোলো হেলথ ইনসিওরেন্ট টিপিএ প্রাইভেট লিমিটেড’।

স্বাস্থ্য ভবনের এই সিদ্ধান্তকে বৃহস্পতিবার স্বাগত জানিয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম মালিকদের নতুন সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড নার্সিংহোম’ (এপিএইচএন)। তবে সরকারি এই পদক্ষেপ নিয়ে এখনই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে নারাজ স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষকর্তারা। এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও।

গত অগস্টে আয়ুষ্মান ভারতের পাশাপাশি রাজ্যে চালু হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প এখনও পুরোপুরি অতীত না হলেও আগামী দিনে নতুন দুই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যবাসীর কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে পরিবর্তনের সরকার। সরকারি হাসপাতালের বিকল্প হিসেবে স্বাস্থ্যবিমা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিপুল রোগীর চাপ সামলাতে এই ধরনের সরকারি প্রকল্পের উপর নির্ভর করেন বহু মানুষ।

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, সেই নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি প্রকল্পের টাকা হাতানোর উদ্দেশ্যে একটি চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। এই চক্রে একাংশ নার্সিংহোমের পাশাপাশি টিপিএ সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন দুই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে টিপিএ-র পরিবর্তে ইমপ্লিমেনটেশন সাপোর্ট এজেন্সি (আইএসএ) হিসেবে কোন সংস্থাগুলি কাজ করবে, তা নির্ধারণের জন্য দরপত্র ডাকা হয়। আটটি সংস্থা ওই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। কিন্তু তার মধ্যে দুই সংস্থাকে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুই সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং তারা সরকারি প্রকল্পের নিয়মকানুন মেনে কাজ করেনি। সেই কারণেই তাদের দরপত্রের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভুয়ো বিল তৈরির অভিযোগ

স্বাস্থ্যবিমার আওতায় চিকিৎসার খরচ অনুমোদনের ক্ষেত্রে টিপিএ সংস্থাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের একাংশের অভিযোগ, কয়েকটি নার্সিংহোম এমন রোগের চিকিৎসার বিলও তৈরি করেছে, যে রোগের চিকিৎসা আদৌ করা হয়নি। অভিযোগ, অনিয়মের এই চক্রে যুক্ত কিছু টিপিএ সংস্থা অভিযুক্ত নার্সিংহোমগুলির সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়ো বিল আটকানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নেয়নি।

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ‘মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজ’ এবং অস্ত্রোপচারের জন্য পৃথক প্যাকেজ রয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজে রোগী ভর্তি হলে চিকিৎসার খরচের নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই। অন্য দিকে, অস্ত্রোপচারের প্যাকেজে খরচের সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের প্যাকেজের আওতায় ভর্তি হওয়ার কথা এমন এক রোগীকে মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজে ভর্তি দেখিয়ে ভুয়ো বিল তৈরি করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তার দাবি, অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচারের রোগীকে মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজের আওতায় দেখিয়ে ৪০ হাজার টাকার বিল বাড়িয়ে ৯০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। শুধু ওই নার্সিংহোমেই এ ধরনের ১৪টি ঘটনার সন্ধান মিলেছে বলে দাবি তাঁর।

এ ছাড়াও, মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নথিতে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত এই ধরনের অস্ত্রোপচার করেন নিউরোসার্জনেরা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমগুলির বিমার নথিতে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক হিসেবে অর্থোপেডিক সার্জনের নাম উল্লেখ ছিল বলে দাবি স্বাস্থ্য ভবনের ওই আধিকারিকের।

নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত নার্সিংহোম সংগঠনের

সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করা এবং ভুয়ো বিল আটকানোর উদ্দেশ্যেই টিপিএ সংস্থাগুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে কিছু সংস্থা অভিযুক্ত নার্সিংহোমগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে।

এপিএইচএন-এর সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে বলেন, তৃণমূল সরকারের আমলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বহু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই অভিযোগগুলির বড় অংশেই মেডি অ্যাসিস্টের মতো টিপিএ সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের তরফে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে টিপিএ-র একাংশের অনৈতিক কাজকর্মের অভিযোগ স্বাস্থ্য ভবনকে একাধিক বার জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

রাজীবের বক্তব্য, অতীতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর প্রকল্পের পরিষেবা সংক্রান্ত একাধিক নির্দেশিকা জারি করা হলেও অভিযুক্ত টিপিএ সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নতুন সরকার এ বার অভিযুক্ত সংস্থাগুলিকে দরপত্রের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ায় তাঁরা খুশি।

তবে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম মালিকদের সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছেন। সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে অনিয়ম রুখতে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.