ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। কেন বিরোধী নেতানেত্রীদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়, চিঠির উত্তরে তার চারটি কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তবে প্রধান বিচারপতি সময় না দিলেও ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসেননি বিরোধীরা। রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, নেহা বোরা এবং অখিলেশ যাদবদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিলও করেন তাঁরা। অন্য দিকে, আদালতকে রাজনীতির মধ্যে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে গত কয়েক দিন ধরেই উত্তপ্ত দিল্লি। এসআইআর-সংক্রান্ত অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও। রাজধানীতে বিক্ষোভ, মিছিল এবং পুলিশের ধরপাকড় ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র পাশাপাশি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-ও জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে পথে নেমেছে। শনিবার তাদের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান কর্মসূচি থাকলেও কোনও মিছিলই শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তরে পৌঁছতে পারেনি।
এর আগে শুক্রবার এসআইআর নিয়ে অভিযোগ জানাতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন ‘ইন্ডিয়া’র ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিরোধী নেতারা জানান, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতির হাতে স্মারকলিপি তুলে দেবেন তাঁরা। সেই উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতিকে চিঠিও পাঠানো হয়। কিন্তু রবিবার বিরোধীদের সেই আবেদন খারিজ করে দেন সূর্য কান্ত।
কেন সাক্ষাৎ নয়? চার যুক্তি প্রধান বিচারপতির
বিরোধী নেতানেত্রীদের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় চারটি বিষয় তুলে ধরেছেন প্রধান বিচারপতি।
প্রথমত, এসআইআর-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে একাধিক মামলা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। তাই শুনানির বাইরে আদালতের প্রশাসনিক স্তরে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, বিরোধীদের তোলা অভিযোগগুলি বিবেচনা করা বা তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ করা আদালতের প্রশাসনিক এক্তিয়ারভুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
তৃতীয়ত, সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ-সহ অন্যান্য বিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে সোমবার এই অভিযোগ নিয়ে কোনও আবেদন বা মামলা দায়ের হলে, পরবর্তী নির্ধারিত শুনানির দিন তা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
চতুর্থত, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি। একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, সাধারণ নাগরিকদের জন্য আদালতের দরজা সব সময় খোলা রয়েছে।
‘আইনশৃঙ্খলার বিষয়, আমার নয়’
প্রধান বিচারপতি সাক্ষাতের অনুমতি না দিলেও সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিল করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে বিরোধী শিবির। দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ, পুলিশের বিধিনিষেধ এবং ধরপাকড় নিয়ে প্রধান বিচারপতিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তাঁর এক্তিয়ারভুক্ত নয়। তাঁর কথায়, ‘‘এটা আমার বিষয় নয়। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার।’’
বিরোধীদের মিছিল নিয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তবে সাধারণ নাগরিক থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি— সকলেরই আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘সাধারণ মানুষ হোক বা নির্বাচিত প্রতিনিধি— যে কেউ চাইলেই আমাদের কাছে আসতে পারেন। সেই অধিকার রয়েছে সকলের। আমরা আইন অনুযায়ী বিষয়গুলি শুনব।’’
‘সুপ্রিম কোর্টকে রাজনীতির মধ্যে টেনে আনবেন না’
বিরোধীদের কর্মসূচির আবহে সোমবার সকালে আইনজীবীদের দায়ের করা একটি মামলার শুনানিতে আদালতকে রাজনীতির বাইরে রাখার পরামর্শ দেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত। তবে সুপ্রিম কোর্টের কাজকর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো উচিত নয়। আন্দোলনকারীদেরও সেই বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
একই সঙ্গে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি। আইনজীবীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন চালানো উচিত। তবে আইনজীবী, আদালতের কর্মী এবং মামলা-মোকদ্দমার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাজকর্মে যেন কোনও ভাবেই বাধা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

