কলকাতা পুরভোটে প্রার্থী খুঁজতে ‘ড্রপ বক্স’ বিজেপির, ২০৯টি ওয়ার্ডেই একক লড়াইয়ের ঘোষণা সুকান্তর

কলকাতা পুরভোটে প্রার্থী খুঁজতে ‘ড্রপ বক্স’ বিজেপির, ২০৯টি ওয়ার্ডেই একক লড়াইয়ের ঘোষণা সুকান্তর

পুজোর পরেই কলকাতায় পুরভোটের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে জোরদার হতে চলেছে। কলকাতা পুরসভার নতুন বোর্ড গঠনের নির্বাচনে প্রার্থী খোঁজার অভিযান শুরু করল বিজেপি। দেবীপক্ষের প্রথম দিনেই প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বিশেষ ‘ড্রপ বক্স’ চালুর ঘোষণা করার পাশাপাশি পুরভোটে দলের লক্ষ্য ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও জানাল গেরুয়া শিবির। রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা কলকাতার পুরভোটে বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সুকান্ত মজুমদার জানান, বিজেপির কর্মী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, প্রার্থী হতে ইচ্ছুক যে কেউ দলের দফতরে বায়োডাটা জমা দিতে পারবেন। একই সঙ্গে শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসংযোগ কর্মসূচি এবং যুবসমাজকে নিয়ে আলোচনাসভার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।

কলকাতার পুরভোট পরিচালনার জন্য বিজেপির গঠিত বিশেষ দলে সুকান্তের সঙ্গে রয়েছেন রাজ্য বিজেপির অন্যতম সহ-সভাপতি রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তথা মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায় এবং কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি। রবিবারের সাংবাদিক বৈঠকে তাঁরাও উপস্থিত ছিলেন।

সুকান্তের বক্তব্য, কলকাতার ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরিয়ে এনে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক মহানগর হিসেবে শহরের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায় বিজেপি। তাঁর অভিযোগ, বাম আমলের ভুল আর্থিক নীতির কারণে কলকাতার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তৃণমূলকে বামেদের ‘অপশাসন’-এর উত্তরসূরি বলে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছরে সিন্ডিকেট-রাজ ও দুর্নীতির কারণে শহরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির কথায়, কলকাতার ইতিবাচক পরিবর্তন ও সামগ্রিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে চায় দল। সুকান্তের দাবি, নতুন সরকার পাঁচ মাসের মধ্যেই কলকাতায় সিন্ডিকেট-রাজ বন্ধ করেছে। কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে সিন্ডিকেটের কার্যকলাপের খবর পাওয়া গেলেও তা দলকে জানাতে নাগরিকদের আহ্বান জানান তিনি।

প্রার্থী হতে ইচ্ছুকদের জন্য ‘ড্রপ বক্স’

কলকাতার পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি বিজেপির পরিসরের বাইরের নাগরিকদেরও যুক্ত করতে চায় দল। সেই লক্ষ্যেই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপত্র গ্রহণের জন্য ‘ড্রপ বক্স’ চালুর কথা ঘোষণা করেন সুকান্ত।

তিনি জানান, প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনের বিজেপি দফতরে একটি ড্রপ বক্স রাখা হবে। সেখানে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নিজেদের বায়োডাটা জমা দিতে পারবেন। বিজেপির কর্মীদের পাশাপাশি দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও আবেদন করতে পারবেন।

চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী ও সমাজসেবীদের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সুকান্ত। তাঁর বক্তব্য, দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ না করে নাগরিকদের সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া উচিত। বিজেপি এমন একটি স্বচ্ছ কলকাতা পুরনিগম গড়তে চায়, যা কোনও প্রোমোটার বা ডেভেলপারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

যুবসমাজকে নিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক আলোচনাসভা

পুরভোটের প্রচারে যুবসমাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সুকান্ত। তাঁর ঘোষণা, কলকাতার প্রতিটি ওয়ার্ডে মানুষের কাছে পৌঁছে স্থানীয় সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা হবে এবং সেগুলির সমাধানের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। এই কর্মসূচিতে যুবসমাজকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক আলোচনাসভার আয়োজন করবে বিজেপি।

সুকান্তের বক্তব্য, যুবসমাজকে শুধু দর্শক বা ভোটার হিসেবে দেখলে চলবে না। শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে তাঁদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় দল।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, যুবসমাজকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আলোচনায় যুক্ত করার এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিজেপি নতুন প্রজন্মকে ঘিরে বিরোধীদের রাজনৈতিক ভাষ্য মোকাবিলা করতে চাইছে। পাশাপাশি, নির্বাচনী প্রচার ও ভোটগ্রহণের দিন যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশলও এর পিছনে থাকতে পারে।

তবে যুবসমাজকে গুরুত্ব দেওয়া বিজেপির রাজনীতিতে নতুন নয় বলে দাবি করেছেন সুকান্ত। নিজের রাজনৈতিক জীবনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে দল বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। প্রায় ৪০ বছর বয়সে তাঁকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাস্তা, পরিবহণ, নিকাশি ও পানীয় জলে অগ্রাধিকার

কলকাতা পুরভোটে বিজেপির সম্ভাব্য ‘সঙ্কল্পপত্র’-এর লক্ষ্য সম্পর্কেও এ দিন আভাস দিয়েছেন সুকান্ত। তাঁর বক্তব্য, কলকাতায় বিজেপির বোর্ড গঠিত হলে রাজ্য সরকার ও পুর প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি দায়বদ্ধ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে।

শহরের রাস্তাঘাট, গণপরিবহণ, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পানীয় জলের সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, কলকাতার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলগুলির স্বকীয়তা বজায় রেখেই পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজেপির পুরভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা।

শহরের বেহাল রাস্তাঘাট মেরামতকে আপাতত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সুকান্ত। তাঁর কথায়, মহালয়ার মধ্যে সব খারাপ রাস্তা মেরামতের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। যদিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি, তবে তৃতীয়ার মধ্যে কলকাতার সমস্ত বেহাল রাস্তা মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে।

কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডের সমস্ত স্তরের মানুষকে শহরের পুনর্গঠনের কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সুকান্ত বলেন, নাগরিকদের সরাসরি এগিয়ে আসতে হবে। বিজেপি সেই অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

২০৯টি ওয়ার্ডেই পদ্ম প্রতীকে লড়াই

কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে কোনও দলের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতা না করার সিদ্ধান্তও ফের স্পষ্ট করে দিয়েছেন সুকান্ত। এনসিপিআই-এর তরফে কলকাতা পুরভোটে বিজেপির জোটসঙ্গী হিসেবে লড়ার দাবি করা হলেও সেই সম্ভাবনা নাকচ করেছেন তিনি।

সুকান্তের ঘোষণা, কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই বিজেপি নিজেদের প্রার্থী দেবে এবং সমস্ত প্রার্থী পদ্ম প্রতীকে নির্বাচনে লড়বেন। অন্য কোনও দলের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতার পথে হাঁটবে না বিজেপি।

প্রার্থী বাছাইয়ে উন্মুক্ত আবেদন গ্রহণ, যুবসমাজকে নিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক আলোচনা এবং শহরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখেই কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতি শুরু করল বিজেপি। এখন নজর, এই উদ্যোগের মাধ্যমে কতটা নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে গেরুয়া শিবির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.