দুর্গোৎসবের আগেই রাজ্যের রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠেছে দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। মঙ্গলবার পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোটগণনা। শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আসনটি ধরে রাখতে পারেন কি না, কিংবা হুমায়ুন কবীরের হাতছাড়া হয়ে রেজিনগর কার দখলে যায়—এই সবকটি প্রশ্নের মীমাংসা হতে চলেছে এই গণনার মধ্য দিয়েই। রাজ্য রাজনীতির অতীতে উপনির্বাচনে শাসকদলের প্রভাব দেখা গেলেও ব্যতিক্রমের উদাহরণও রয়েছে, ফলে উভয় কেন্দ্রকে ঘিরেই কৌতুহল তুঙ্গে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—উভয় কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রটি নিজের কাছে রেখে নন্দীগ্রাম পদটি ত্যাগ করেন। অন্যদিকে, রেজিনগর ও নওদা দুই কেন্দ্র থেকে জয়ী হুমায়ুন কবীর নওদা আসনটি রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেন। এর ফলে নির্বাচন কমিশনকে এই দুই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করতে হয়। ভোটের দিন দুই কেন্দ্রেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ তুললেও বিজেপি তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে।
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস দুটি স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারস্পরিক বিরোধের কারণে নির্বাচন কমিশন দলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দেয়। পরবর্তীতে নতুন নাম ও প্রতীক পেলেও মমতার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী নন্দীগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি; তাদের মনোনীত প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরও তা প্রত্যাহার করে নেন। এই কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন জানাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থী হয়েছেন মহম্মদ এহেতাশ মুল হক। বিজেপি এই আসনে শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত আপ্তসহায়কের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে।
রেজিনগর আসনে হুমায়ুন কবীর পদত্যাগ করলেও তাঁর পুত্র গোলাম নবি আজ়াদকে সেখানে প্রার্থী করেছিলেন। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন হুমায়ুন। মঙ্গলবার ভোট চলাকালীন তাঁকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। বুধবার তিনি ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, শুভেন্দু অধিকারী কথা রাখেননি এবং তাঁর পুত্র গোলামও তাঁর সঙ্গে ‘গদ্দারি’ করেছেন। এই পরিস্থিতে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর পুত্র গোলাম নবি আজ়াদও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে রেজিনগরে বিজেপি বিপুল ব্যবধানে জিতবে, তবে তিনি একে জনগণের রায়ের বদলে ‘ভোট লুট’-এর ফল হিসেবে বর্ণনা করেন। এই কেন্দ্রে কালীঘাট তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী এবং বিজেপির প্রার্থী শাখারভ সরকার। বিজেপির তরফে বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণ খণ্ডন করা হয়েছে।
নন্দীগ্রামে ভোটের আগেই কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ২০০৭ সালের একটি পুরনো খুনের মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের বিরুদ্ধে অপহরণ এবং প্রার্থিপদ প্রত্যাহারের চাপের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি তিন সপ্তাহের জন্য অন্তর্বর্তী জামিনে মুক্ত রয়েছেন এবং তাঁকে ২১ অক্টোবর হলদিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
রেজিনগরে ঋতব্রত শিবিরের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন শেখ সফিউদ্দিন জামান। বাম শরিক দলগুলির মধ্যে সিপিএম-এর টিকিটে সইদ আসাদ আলি এবং আরএসপি-র টিকিটে বিকাশচন্দ্র মিশ্র লড়েছেন। কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন আব্দুল্লাহিল কাফি। অন্যদিকে, নন্দীগ্রাম আসনে সিপিআই-এর টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন শান্তিগোপাল গিরি।

