এশিয়ান গেমসে ইতিহাস গড়ে রেকর্ড গড়ে ফেলল ভারতের মহিলা হকি দল। দীর্ঘ ৪৪ বছরের খরা কাটিয়ে ঐতিহাসিক সোনা জয় করল ভারত। শুক্রবার এক রোমাঞ্চকর ফাইনালে শক্তিশালী চিনকে ১-০ গোলে হারিয়ে খেতাব ছিনিয়ে নেন ভারতীয় মেয়েরা। ম্যাচের একমাত্র ও নির্ণায়ক গোলটি করেন লালরেমসিয়ামি। ১৯৮২ সালে প্রথম এশিয়ান গেমসে মহিলা হকিতে সোনা জিতেছিল ভারত; ৪৪ বছর পর ফের এশিয়াডের সেরা হলো তারা। এই অবিস্মরণীয় জয়ের সঙ্গেই ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে নিজেদের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলল ভারত।
মহিলা হকির এই সাফল্যের পাশাপাশি শুক্রবার নাগোয়া গেমসে এক দিনে রেকর্ড ৬টি সোনা জিতেছে ভারত। বক্সিংয়ে এসেছে সোনার হ্যাটট্রিক, এছাড়া কুস্তি ও তিরন্দাজি থেকেও এসেছে শীর্ষ পদক। এক দিনের এই অভাবনীয় সাফল্যের ওপর ভর করে পদকতালিকায় এক লাফে ৫ নম্বরে উঠে এসেছে ভারত। এই মুহূর্তে ভারতের ঝুলিতে রয়েছে ১৬টি সোনা, ২৫টি রুপো এবং ৩৫টি ব্রোঞ্জসহ সর্বমোট ৭৬টি পদক।
ট্র্যাফিক জ্যাম কাটিয়ে মাঠে নামা, সবিতার বীরত্ব ও লালরেমসিয়ামির ২০০তম ম্যাচের স্মৃতি
ট্র্যাফিক জ্যামে দুই দলের বাস আটকে পড়ায় নির্ধারিত সময় দুপুর ৩:৩০-এর পরিবর্তে ম্যাচ শুরু হয় বিকেল ৪:৩০-এ। ম্যাচটি ভারতের লালরেমসিয়ামির জন্য অত্যন্ত বিশেষ ছিল, কারণ এটি ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচ।
- প্রথম কোয়ার্টার (১-০): গত অলিম্পিক্সে রুপো জয়ী চিনের আক্রমণাত্মক ফুটওয়ার্ক ও চাপ সামলে খেলার বিপরীত স্রোতে ভেসে প্রথম কোয়ার্টারেই গোল পায় ভারত। ডি বক্সে চমৎকার শটে ভারতকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন মাইলফলক স্পর্শ করা লালরেমসিয়ামি।
- সবিতার দুর্দান্ত পেনাল্টি সেভ: দ্বিতীয় কোয়ার্টার থেকে সমতা ফেরাতে মরিয়া আক্রমণ চালায় চিন। চীনের এক খেলোয়াড়কে ফাউল করায় তাদের পক্ষে পেনাল্টি স্ট্রোক দেন রেফারি। কিন্তু ভারতীয় গোলকিপার সবিতা পুনিয়া অসাধারণ দক্ষতায় চিনের ঝাং ইংয়ের পেনাল্টি শটটি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচিয়ে দেন।
- জমাট রক্ষণ ও ইতিহাস: তৃতীয় ও চতুর্থ কোয়ার্টারেও চিনের একাধিক পেনাল্টি কর্নার ও আক্রমণ নস্যাৎ করে দেন নবনীত কৌর ও সালিমা টেটে। শেষ মুহূর্তে গোলকিপার তুলে ফিল্ড প্লেয়ার নামিয়েও চিনের শেষ রক্ষা হয়নি। রেফারির শেষ হুটার বাজতেই কোচ শোয়ার্ড মারিন সহ পুরো ভারতীয় দল আনন্দে মেতে ওঠে।
বক্সিংয়ে সোনার হ্যাটট্রিক: নিজের জন্মদিনে সোনা লভলিনার
শুক্রবার বক্সিংয়ের রিংয়ে ভারতীয় প্রতিযোগীদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। ১. লভলিনা বরগোঁহাই (৭৫ কেজি): নিজের ২৯তম জন্মদিনে চিনের বাও জিয়াউকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে সোনা জেতেন অলিম্পিক পদকজয়ী লভলিনা। প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক খেলে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ দেননি তিনি। ২. পারভিন হুডা (৬৫ কেজি): চাইনিজ তাইপের অলিম্পিক পদকজয়ী চেন নিয়েন চিনকে টেকনিক্যাল সুপিরিয়রিটিতে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কঠিন ফাইনালে সোনা জেতেন পারভিন। ৩. অঙ্কুশ পাঙ্ঘাল (৮০ কেজি): দক্ষিণ কোরিয়ার কিম মিনসেয়ঙকে একতরফা ৪-০ ব্যবধানে হারিয়ে সোনা জয় নিশ্চিত করেন অঙ্কুশ।
তিরন্দাজিতে সোনা-রুপো ও কুস্তিতে অলৌকিক প্রত্যাবর্তন
- মেয়েদের রিকার্ভ তিরন্দাজি: ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে সোনা জেতে ভারতের অঙ্কিতা ভকত, কীর্তি ও কুমকুম মোহদের দল। সেমিফাইনালে তাঁরা চিনকেও ৫-১ ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। চলতি গেমসে তিরন্দাজি থেকে এটি ভারতের চতুর্থ সোনা। তবে রিকার্ভ মিক্সড দলগত বিভাগে কুমকুম-ধীরজ বোম্মাদেভারা জুটি চিনের কাছে ৩-৫ ব্যবধানে হেরে রুপো পেয়েছেন।
- ফ্রিস্টাইল কুস্তি (৬৫ কেজি): ভারতের সুজিত কলখল অলৌকিক এক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে সোনা এনে দেন। প্রথম রাউন্ডে ২-৯ পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় রাউন্ডে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাজিকিস্তানের কুদিয়েভ আব্দুলমজিদকে ১০-৯ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন সুজিত।
এছাড়া সেপকটাকরোয় ছেলেদের কোয়াড্রান্ট ইভেন্টের সেমিফাইনালে জাপানের কাছে ০-২ সেটে হেরে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে ভারত। হকির ঐতিহ্যবাহী সাফল্য এবং এক দিনে আধিপত্যের ওপর ভর করে গেমসে ভারতের এই পদক যাত্রা দেশের ক্রীড়াজগতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল।

