নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: মৃত বেড়ে ছাড়াল হাজার, দেহ শনাক্তকরণ ও ফেরানোর নির্দেশিকা ভারতীয় দূতাবাসের

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: মৃত বেড়ে ছাড়াল হাজার, দেহ শনাক্তকরণ ও ফেরানোর নির্দেশিকা ভারতীয় দূতাবাসের

নেপালে গত ২৬ অগাস্টের বিধ্বংসী হড়পা বান ও হিমবাহ ধসের পর উদ্ধারকাজে একের পর এক মর্মান্তিক তথ্য সামনে আসছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরআরএমএ)-র তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ১,০৫০ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে (যদিও প্রতিবেদনের শুরুতে মোট ১,০০৩ জনের কথা বলা হলেও পরবর্তী জেলাভিত্তিক তথ্যে সংখ্যাটি ১,০৫০ বলা হয়েছে)। তবে এখনও প্রায় চার হাজার মানুষের কোনও হদিস মেলেনি। বিপর্যয়স্থল থেকে এখনও পর্যন্ত ১২ হাজার জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নতুন করে কোনো ভারতীয় নাগরিকের উদ্ধারের খবর মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস মৃতদের দেহ শনাক্তকরণ এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট ৯ দফা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও নিখোঁজদের করুণ পরিণতি নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিপর্যস্ত আটটি জেলা থেকে নতুন করে দেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ান থেকে সর্বোচ্চ ৩২১টি, নওয়ালপারাসি পূর্ব থেকে ২১৬টি, নওয়ালপারাসি পশ্চিম থেকে ১৭০টি, নুয়াকোট থেকে ৯৫টি, গোর্খা থেকে ৬৫টি, ধড়িং থেকে ৫৭টি, রাসুয়া থেকে ৪১টি এবং তানাহুন থেকে ৩৮ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে, চিনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী তিব্বতে এই দুর্যোগে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভোটকোশী নদীতে হড়পা বানের ছ’দিন পরেও বহু মানুষের সন্ধান না মেলায় অনেক পরিবারই বাঁচার আশা ত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার বহু নেপালি পরিবার নিখোঁজ আত্মীয়দের সন্ধান না পেয়ে কুশপুতুল তৈরি করে আচার মেনে ‘প্রতীকী দাহ’ সম্পন্ন করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমেই প্রিয়জনদের আত্মা শান্তি পাবে।

ভারতীয় দূতাবাসের ৯ দফা নির্দেশিকা নেপালে মর্মান্তিক এই বিপর্যয়ে মৃত ভারতীয়দের বা নিখোঁজদের দেহ শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। নেপাল সরকারের নিয়ম মেনে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যার প্রধান ধাপগুলি হলো: ১. দেহের নথিভুক্তকরণ ২. ছবি তুলে বিশদে তথ্য দাখিল ৩. ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা ৪. মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় ৫. শনাক্তকরণের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি পেশ ৬. ডিএনএ ও ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ ৭. দূতাবাসের সহযোগিতায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ৮. মেমো প্রস্তুত করা ৯. যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেহ হস্তান্তর

প্রাথমিক ধাপগুলি নেপাল প্রশাসন নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করবে। নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছবি দেখে যদি কেউ স্বজনের দেহ শনাক্ত করতে পারেন, তবে তাঁদের অবিলম্বে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। যে সমস্ত দেহ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়, সেগুলির ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নেপালের সাহায্যের আবেদন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল এবং দেশটির পরিবেশ মন্ত্রকের অধীনস্থ জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মহেশ্বর ধাকালের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের ফলেই হিমালয়ে এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি লাগাতার বাড়ছে। গত সপ্তাহের হড়পা বান এবং তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পেছনেও এই কারণ রয়েছে। ২০২০ সালের এক গবেষণায় নেপাল, চিন ও ভারতের ৪৭টি হিমবাহ হ্রদের পাড় ভাঙার ঝুঁকির কথা বিজ্ঞানীরা আগেই জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপুঞ্জও এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

এই বিশাল বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে এবং বিধ্বস্ত নেপালের পুনর্গঠনে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৫০০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা) প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মোকাবিলায় রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ তহবিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সাহায্যের আর্জি জানিয়েছে নেপাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.