মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’-এ সন্তানহারা দুই মা; দ্রুত ন্যায়বিচার ও চিকিৎসার খরচ বহনের আশ্বাস শুভেন্দুর

মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’-এ সন্তানহারা দুই মা; দ্রুত ন্যায়বিচার ও চিকিৎসার খরচ বহনের আশ্বাস শুভেন্দুর

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতার দরবার’-এ এবার স্বজন হারানোর বিচার এবং চিকিৎসার আর্জি নিয়ে হাজির হলেন সাধারণ মানুষ। শনিবার সকালে সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য সদর দফতরে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়েছিলেন দুই সন্তানহারা মা। তাঁদের একজন বাঁশদ্রোণীর স্কুলছাত্রের রহস্যমৃত্যুর বিচার চান এবং অন্যজন আরজি কর-কাণ্ডের কয়েক মাস আগে প্রাণ হারানো এক ডাক্তারি পড়ুয়ার মা। এ ছাড়াও চিকিৎসার খরচ জোগাতে অক্ষম আরও এক মায়ের মেয়ের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

বাঁশদ্রোণীর স্কুলছাত্রের মৃত্যুর বিচার প্রার্থনা

জনতার দরবারে হাজির হয়েছিলেন গত ২৪ মে প্রয়াত আট বছর বয়সী স্কুলছাত্র আয়ুষকুমার নাথের মা। তাঁর অভিযোগ, গত ১৩ মে বাঁশদ্রোণীর মহাঋষি বিদ্যামন্দিরে গিয়ে শিশুটি অসুস্থ বোধ করলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ বা তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি। উল্টে শ্রেণিশিক্ষিকা তাকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে বলেন। পরে স্কুলের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আয়ুষ পড়ে যায় এবং মাথায় চোট পায়। প্রথমে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল ও পরে এসএসকেএমে ভর্তি করা হলে ১০ দিন সংজ্ঞাহীন থাকার পর ২৪ মে তার মৃত্যু হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন আয়ুষের মা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত ‘সংবেদনশীল ভাবে’ বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

বর্ধমান মেডিকেলের ছাত্রের মৃত্যু ও ‘থ্রেট কালচার’

মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে হাজির হয়েছিলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের মৃত ছাত্র অমর্ত্য ঘোষালের মা-ও। ২০২৪ সালে আরজি কর-কাণ্ডের মাত্র দু’মাস আগে ক্যাম্পাসের বাইরে অমর্ত্যের রহস্যমৃত্যু হয়। ছাত্রের পরিবারের অভিযোগ, অমর্ত্য ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকি সংস্কৃতির শিকার হয়েছিলেন। এই ঘটনায় সন্দীপ রায় নামে এক মত্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলেও পুলিশের তদন্তে অসন্তুষ্ট হয়ে পরিবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম পুলিশের তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে সিআইডি (CID) তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু সিআইডি-র তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছে পরিবার।

মৃত ছাত্রের মায়ের সমস্ত অভিযোগ মনোযোগ সহকারে শোনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, আরজি কর-কাণ্ডের পর বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজেও হুমকি সংস্কৃতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং ‘দাদাগিরি’তে অভিযুক্ত চিকিৎসক বিরূপাক্ষ বিশ্বাসকে সম্প্রতি চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

মেয়ের চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী

ধাপা মাঠপুকুর এলাকা থেকে জনতার দরবারে এসেছিলেন করুণা বাউড়ি। তাঁর মেয়ের মুখে একটি জটিল টিউমার হয়েছে, যার চিকিৎসা চলছে ভেলোরের সিএমসি-তে। করুণা দেবী জানান, ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ডের মাধ্যমে প্রথম দফায় কিছু টাকা মিললেও পরবর্তী সময়ে আর কোনো অর্থ মেলেনি। ফলে অর্থাভাবে মেয়ের চিকিৎসা চালানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর করুণা দেবী জানান:

“মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। আমার মেয়ের চিকিৎসার সমস্ত খরচ তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।”

আশাকর্মীদের সুপারভাইজারদের বেতন বৃদ্ধির দাবি

এদিন অভাব-অভিযোগ জানাতে দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন ফার্স্ট টিয়ার সুপারভাইজ়ার (FTS)-রা, যাঁরা মূলত আশাকর্মীদের কাজের তদারকি বা ‘সুপারভাইজ’ করেন। তাঁদের অভিযোগ, মাত্র সাড়ে ছ’হাজার টাকা ফিক্সড বেতন ছাড়া তাঁরা আর কোনো অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা পান না। বেতন বৃদ্ধি সহ একগুচ্ছ দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।

নির্ধারিত দিনের আগেই বসল দরবার

রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ ও ক্ষোভের কথা সরাসরি শুনতে এই ‘জনতার দরবার’ কর্মসূচি চালু করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপির পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতি সোমবার সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই দরবার বসার কথা ছিল। তবে পূর্ব নির্ধারিত সূচির বাইরে গিয়ে বিশেষ কারণে এই সপ্তাহের দরবারটি শনিবার সকালেই অনুষ্ঠিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে দ্রুত যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.