হরমুজ় প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ভারত ও আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের কড়া প্রতিবাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানি তেলের অবৈধ পরিবহণ এবং হরমুজ় প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ লঙ্ঘনের ঘটনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ভারতের তীব্র প্রতিবাদ
গত ৮ জুন থেকে ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিকবাহী তিনটি জাহাজের ওপর পর পর হামলার ঘটনা ঘটে, যার নেপথ্যে সেখানে মোতায়েন মার্কিন সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
- মাউন্ট সেটবেলো (Mount Setbello): এই জাহাজে মোট ২৮ জন নাবিক ছিলেন, যার মধ্যে ২৪ জন ভারতীয়, ২ জন পাকিস্তানি, ১ জন রুশ এবং ১ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক। হামলার পর ২১ জনকে উদ্ধার করা গেলেও মার্কিন বাহিনীর এই হানায় ৩ জন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান।
- এমটি মারিভেক্স (MT Marivex): এই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককেই অবশ্য নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এই ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয় এবং বিরোধী দলগুলিও সরব হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বুধবার ভারতে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক জেসনকে ডেকে পাঠায় ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক। ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, “বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অসামরিক পরিকাঠামোকে নিশানা করা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে স্বাধীন ও বাধাহীন নৌচলাচল নিশ্চিত করতে হবে।”
জয়শঙ্করের বার্তা ও ওয়াশিংটনের অনমনীয় ‘জবাব’
নয়াদিল্লির এই আপত্তির পরেও হরমুজ় প্রণালীর কাছে ‘মাউন্ট জলবীর’ (Mount Jalbir) নামক আরও একটি ভারতীয় নাবিকচালিত পণ্যবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। পরে সেখান থেকে অন্তত ২০ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়। আমেরিকার দাবি, জাহাজটি বেআইনিভাবে ইরান থেকে তেল পরিবহণ করছিল এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশ অমান্য করায় তার ইঞ্জিনরুম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
এরই প্রতিবাদে শুক্রবার ফের মার্কিন কূটনীতিক জেসনকে তলব করে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক। পাশাপাশি বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োকে একটি কড়া বার্তা পাঠান। পরবর্তীতে সমাজমাধ্যমে জয়শঙ্কর লেখেন:
“বাণিজ্যিক জাহাজের উপর এমন প্রাণঘাতী হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তবে জয়শঙ্করের এই বার্তার জবাবে ওয়াশিংটন তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। শনিবার মার্কিন বিদেশ দফতরের মুখপাত্র টমি পিগট জানান, মার্কিন বিদেশসচিব জোর দিয়ে বলেছেন যে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতেই মার্কিন বাহিনী কাজ করছে এবং সব বাণিজ্যিক জাহাজকে মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনেই চলতে হবে। রুবিয়োকে উদ্ধৃত করে মুখপাত্র স্পষ্ট করে দেন যে, মার্কিন অবরোধের লঙ্ঘন এবং ইরানি তেলের অবৈধ পরিবহণ কোনো পরিস্থিতিতেই সহ্য করা হবে না।
এই ঘটনার ফলে দুই বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন করে এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলো বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

