২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া টেট (TET) সংক্রান্ত একটি রায়ের জেরে দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ স্কুলশিক্ষকের পেশাজীবন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই আইনি জটিলতা থেকে শিক্ষকদের রেহাই দিতে এবার সংসদের আগামী বাদল অধিবেশনে আইন সংশোধনের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) ভাবধারায় পুষ্ট শিক্ষক সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ’ (ABRSM)-এর পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যালয় শাখা।
পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও শিক্ষক সমাজের এই জ্বলন্ত ইস্যুতে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী—উভয় শিবিরের শিক্ষক সংগঠনগুলিই এখন কার্যত একই সুরে কেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেছে।
দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক
শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এবিআরএসএম-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক জানান, আগামী ১৮ জুন দেশজুড়ে সব জেলাশাসকের (DM) দফতরের সামনে বিক্ষোভ, ধর্না ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। এরপর জেলাশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পাঠানো হবে।
সংগঠনের মূল দাবি, সংসদের আগামী বাদল অধিবেশনে প্রয়োজনে অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (NCTE)-এর নিয়ম সংশোধন করতে হবে, যাতে কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি সুরক্ষিত থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও উদ্ভূত জটিলতা
২০২৫ সালের একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, দেশের প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের সব শিক্ষকের জন্য ‘টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট’ বা টেট উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। যাঁরা এখনও টেট পাশ করেননি, তাঁদের ২০২৮ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে যাঁদের চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে (অবসর নেবেন), তাঁদের এই নিয়মের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
শিক্ষক সংগঠনগুলির বক্তব্য, ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইন (RTE) ২০১০ সালে কার্যকর হয় এবং সেই অনুযায়ী এনসিটিই (NCTE) বিধি তৈরি করে। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাই মাস থেকে শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণে টেট বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে, ২০১১ সালের আগে যাঁরা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়োগের সময় টেট পাশের কোনও নিয়মই ছিল না।
বর্তমানে দেশে এমন প্রায় ২০ লক্ষ শিক্ষক রয়েছেন যাঁরা টেট উত্তীর্ণ নন। কেবল পশ্চিমবঙ্গেই এই শিক্ষকের সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। এই বিপুল সংখ্যক প্রবীণ শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি ‘নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি’ এই রায় পুনর্বিবেচনার (Review) আর্জি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে, যাতে ২০১১ সালের আগের কর্মরত শিক্ষকদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হয়।
কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক তরজা
কর্মরত শিক্ষকদের টেট বাধ্যতামূলক করার এই নির্দেশিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনগুলি কলকাতায় মিছিল ও অবস্থান বিক্ষোভ করেছে। ‘বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি’-র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন:
“কর্মরত শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক টেটের এই সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী কলকাতায় এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, রাজ্যে তাঁরা ক্ষমতায় এলে বিষয়টি দেখবেন। রাজ্যে তো ক্ষমতার পরিবর্তন হলো, কিন্তু বিষয়ের কোনও সমাধান হলো না! এমনকি সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশনের শুনানিতে কেন্দ্র কোনও আইনজীবীও পাঠায়নি। এটি শিক্ষকদের সাথে বড় প্রতারণা।”
অন্যদিকে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ওপর দায় চাপাতে নারাজ আরএসএস পন্থী সংগঠন এবিআরএসএম। কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বাপি প্রামাণিক বলেন, “আসল ভুলটি হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে এনসিটিই এই ত্রুটিপূর্ণ বিধি তৈরি করেছিল। তখন ক্ষমতায় কারা ছিল, তা সবার জানা।”
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেই বিষয়টি সামনে আসে এবং তাঁরা কেন্দ্রের কাছে দরবার করেন। বর্তমানে কোনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়টি আটকে রয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। আর সেই কারণেই আমলাদের ওপর ভরসা না রেখে আগামী বাদল অধিবেশনে সরাসরি আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই মহাসঙ্কট কাটার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

