তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে ধৃত স্বরূপ বিশ্বাস: ‘নিজের কর্মের ফল ভুগছেন’, বিস্ফোরক সাংসদ-অভিনেতা দেব

তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে ধৃত স্বরূপ বিশ্বাস: ‘নিজের কর্মের ফল ভুগছেন’, বিস্ফোরক সাংসদ-অভিনেতা দেব

টলিউড স্টুডিও পাড়ায় ‘দাপট’ চালানো ও স্বৈরাচারী মনোভাবের অভিযোগে অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়লেন স্বরূপ বিশ্বাস। বৃহস্পতিবার রাতে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ তোলাবাজি এবং এক রূপটানশিল্পীকে (মেকআপ আর্টিস্ট) শ্লীলতাহানির অভিযোগে তৃণমূল নেতা অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপকে গ্রেফতার করে। শুক্রবার সকালে তাঁকে আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। এই গ্রেফতারির পরই টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র মহলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। এত দিন পর এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন তৃণমূলের বিদায়ী সাংসদ তথা সুপারস্টার দেব (দীপক অধিকারী)। আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন তিনি।

‘হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে কিসের লড়াই’: দেব

স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারি প্রসঙ্গে দেব অত্যন্ত সংযত অথচ কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “কী বলব একজন হেরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে! হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে লড়াই করব? যে যার কর্মের ফল ভুগবে। যখন ওঁর ভাল সময় ছিল, তিনি সকলের খারাপ সময় এনে দিয়েছিলেন।”

দেব নিজেই তাঁর সঙ্গে ঘটা এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রথম বার প্রকাশ্যে এনে জানান, তাঁকেও এক সময় সমাজমাধ্যমে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ক্ষমা না চাইলে তাঁকে আর কাজ করতে দেওয়া হবে না। তবে তিনি নিজের লড়াই লড়েছেন।

টলিউডে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি ও টেকনিশিয়ানদের হেনস্থা

দেবের অভিযোগ, স্বরূপ বিশ্বাসের কারণে টলিউডের বহু শিল্পী ও টেকনিশিয়ানকে অন্যায়ভাবে ‘ব্যান’ বা নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে অনেকের রুজি-রুটি বন্ধ হয়ে যায় এবং কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার উপক্রমও করেছিলেন। দেবের কথায়:

“আমার কাছে ওঁর বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ এসেছে। আমি অনেক টেকনিশিয়ানের পাশে দাঁড়িয়েছি। আর্টিস্ট ফোরামকেও মেল পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তখন তারা স্বরূপ বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহস দেখায়নি। যদি দল (তৃণমূল) আবার জিতত, তবে স্বরূপকে আটকানো মুশকিল হতো। হয়তো এবার আমিই ব্যান হয়ে যেতাম।”

তিনি আরও জানান, তাঁর নতুন ছবি ‘দেশু ৭’-এর ঘোষণার পর স্ক্রিনিং কমিটিতে ভোট না দেওয়ার কারণে তাঁর ছবি রিলিজ করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি লালবাজারে তাঁর নামে অভিযোগ জানাতেও গিয়েছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস। দেবের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে আসা প্রযোজকদেরও কলকাতায় শুটিং করার জন্য স্বরূপের থেকে অনুমতি নিতে বাধ্য করা হতো। দেব প্রশ্ন তোলেন, “স্বরূপ বিশ্বাস অনুমতি দেবেন কেন? তিনি তো ভগবান নন।”

‘রুদ্রনীল-হিরণদের প্রতি মানুষের সম্মান বেড়েছে’

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা বহুবার জানিয়েছিলেন বলে জানান দেব। তিনি স্পষ্ট বলেন, “আমাদের সকলের সেই সময়ে আরও প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। রুদ্রনীল (ঘোষ), হিরণ (চট্টোপাধ্যায়) তো প্রতিবাদ করে অন্য দলে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি আজ মানুষের সম্মান বেশি।” তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ (অরূপ ও স্বরূপ) চাইলে আরও ভালোভাবে ইন্ডাস্ট্রি চালাতে পারতেন, কিন্তু তাঁরা তা করেননি। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বজায় রয়েছে জানিয়ে দেব বলেন, ‘দিদি’ তো বিশ্বাস করেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি জানতেন না স্বরূপ এমনটা করবেন।

যাঁরা আগামী দিনে ইন্ডাস্ট্রি চালাবেন, তাঁদের প্রতি দেবের অনুরোধ— তাঁরা যেন স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ভুল না করে প্রতিভাকে প্রাধান্য দেন। পাশাপাশি যে রূপটানশিল্পীর অভিযোগে স্বরূপ গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁকে কাজের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন দেব।

নতুন সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতি ভরসা

রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন সরকারকে একটু সময় দেওয়ার পক্ষপাতী দেব। তিনি মনে করেন, নতুন সরকার ইন্ডাস্ট্রিকে বোঝার চেষ্টা করছে এবং সব গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে।

একই সঙ্গে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রসঙ্গে দেব জানান, নতুন সরকারের সঙ্গে এখনও তাঁর সরাসরি কথা হয়নি। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে কেন্দ্র ও রাজ্যের ৫০-৫০ শতাংশ আর্থিক অংশীদারিত্বে কাজ করার কথা ঘোষণা করেছেন, তাতে তিনি আশাবাদী। দেব বলেন, “শুভেন্দুদা আছেন বলে আমার বিশ্বাস, সময়েই কাজটা শেষ হবে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও মেদিনীপুরের মানুষ, তিনি জানেন এই প্রজেক্টটা কতটা জরুরি।”

কুণাল ঘোষের প্রতিক্রিয়া

এই বিষয়ে তৃণমূলের বিধায়ক তথা অভিনেতা কুণাল ঘোষ জানান, অতীতে তিনি যখন টালিগঞ্জে কাজ করেছেন তখন স্বরূপেরা ছিলেন না। সাম্প্রতিক কিছু ছবিতে কাজ করার সময় তিনি শুধু দেখেছেন যে তাঁরা টেকনিশিয়ানদের নিয়ে কাজ করেন, এর গভীরে কী ছিল তা তাঁর জানা নেই। তবে দেব ও বিশ্বাস ব্রাদার্সের দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেব এক নম্বর সুপারস্টার। ওঁর সঙ্গে বিশ্বাস ব্রাদার্সের দ্বন্দ্বের কথা সকলের মতো আমিও জানি। এর বাইরে কোনও মন্তব্য নেই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.