ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সৌন্দর্য ও অভিনয়ের এক অনন্য নাম মধুবালা। সমকালীন বিশ্ব তাঁকে ‘বিউটি কুইন’ বা ‘ভেনাস’ বলে অভিহিত করলেও, পর্দার বাইরের এই মানুষটির জীবন ছিল প্রেম, বিচ্ছেদ আর যন্ত্রণায় মোড়া। সম্প্রতি কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এই কালজয়ী অভিনেত্রীর জীবনের কিছু অজানা ও মৰ্মস্পৰ্শী অধ্যায়।
অধরা স্বপ্ন ও কিশোর কুমারের আক্ষেপ
মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতে পা রাখার পর লতা মঙ্গেশকরের তীব্র ইচ্ছা ছিল মধুবালার সঙ্গে কাজ করার। সুরাইয়া বা নার্গিসের মতো বরেণ্য অভিনেত্রীদের সান্নিধ্য পেলেও মধুবালার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনি। মধুবালার অকাল অসুস্থতা ও নিভৃতবাসই ছিল এর প্রধান কারণ।
কিশোর কুমারের সঙ্গে মধুবালার পরিণয় ও পরবর্তী জীবন সম্পর্কে লতা জানান, সত্যেন বসুর ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ ছবির সেট থেকেই তাঁদের প্রেমের সূত্রপাত। তবে বিয়ের পরেই মধুবালা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিশোর কুমারের গভীর শূন্যতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কিশোরদা আফসোস করতেন এই ভেবে যে, ভালোবেসে বিয়ে করলেও মধুবালার সঙ্গে তাঁর সংসার করা হয়ে ওঠেনি। অসুস্থ স্ত্রীর পাশে সারাদিন বসে থেকে দিনশেষে কিশোর কুমারকে ফিরতে হতো একাকী শূন্য বাড়িতে।
সৌন্দর্য ও তুলনা
লতা মঙ্গেশকরের মতে, ভারতীয় সিনেমায় মধুবালার মতো সুন্দরী দ্বিতীয় কেউ নেই। বাংলার সুচিত্রা সেন বা সুমিত্রা দেবীর মতো চিরায়ত সুন্দরীদের সারিতেই তাঁকে স্থান দেন তিনি। তৎকালীন বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বই) তিনি সর্বজনস্বীকৃত ‘ভেনাস’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দিলীপ কুমারের সঙ্গে বিচ্ছেদ ও আইনি লড়াই
মধুবালার জীবনের অন্যতম ট্র্যাজিক অধ্যায় ছিল অভিনেতা ইউসুফ খান বা দিলীপ কুমারের সঙ্গে তাঁর প্রেম। লতা জানান, মধুবালার বোন মধুরজির কাছ থেকে তিনি জেনেছিলেন যে, তাঁদের প্রেম ছিল অত্যন্ত গভীর। কিন্তু মধুবালার পিতার বিরোধিতার কারণে সেই সম্পর্ক পূর্ণতা পায়নি। বি.আর. চোপড়ার ‘নয়া দৌড়’ ছবিতে এই জুটির কাজ করার কথা থাকলেও আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে শেষ পর্যন্ত মধুবালার পরিবর্তে বৈজয়ন্তীমালাকে নেওয়া হয়।
‘মুঘল-এ-আজম’: পর্দার কষ্টের আড়ালে নিষ্ঠুর বাস্তবতা
কে. আসিফ পরিচালিত কালজয়ী ছবি ‘মুঘল-এ-আজম’-এর শুটিং অভিজ্ঞতার এক ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে এই স্মৃতিচারণায়। ছবির পরিচালক আসিফ সাহেব ছিলেন অত্যন্ত জেদি। লতা জানান:
“মুঘল-এ-আজম-এর শুটিংয়ের সময় মধুবালাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভারী লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হতো। গরমের মধ্যে সেই যন্ত্রণায় মধুবালা কাঁদতেন এবং মুক্তি চাইতেন। কিন্তু পরিচালক চাইতেন সেই প্রকৃত কষ্টই যেন পর্দার অভিনয়ে ফুটে ওঠে।”
শেষ দিনগুলোর একাকীত্ব
চিকিৎসকদের পরামর্শে সাংসারিক জীবন থেকে দূরে থাকা মধুবালা শেষ জীবনে বাপের বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাইরের জগতের কারও সঙ্গেই তাঁর দেখা করার অনুমতি ছিল না। এক প্রবল কৌতূহল আর গুণমুগ্ধতা নিয়ে লতা মঙ্গেশকর আজীবন তাঁর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন সেইসব মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছিলেন।
মধুবালা আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক রহস্যময়ী ও অপরূপা সুন্দরীর প্রতীক হয়ে রয়ে গেছেন, যাঁর জীবনের আলো ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর দীর্ঘশ্বাস।

