স্কটল্যান্ডের জার্সিতে অনন্যা এক বাঙালি কন্যা, বিশ্বমঞ্চ মাতাতে তৈরি প্রিয়নাজ চট্টোপাধ্যায়

স্কটল্যান্ডের জার্সিতে অনন্যা এক বাঙালি কন্যা, বিশ্বমঞ্চ মাতাতে তৈরি প্রিয়নাজ চট্টোপাধ্যায়

নাম শুনলে মনে হবে আদ্যোপান্ত বাঙালি, কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন স্কটল্যান্ডের। বিশ্ব ক্রিকেটের আঙিনায় মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত আরও এক বাঙালি কন্যা—প্রিয়নাজ চট্টোপাধ্যায়। সম্প্রতি বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে দারুণ পারফর্ম করে স্কটল্যান্ডকে মূল পর্বে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। যোগ্যতা অর্জন পর্বে তৃতীয় স্থান অধিকার করে মূল পর্বের টিকিট কাটে স্কটিশরা।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে শুভসূচনা করেছে স্কটল্যান্ড। সেই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে ৫ রান করার পাশাপাশি বল হাতেও এক ওভার অবদান রাখেন প্রিয়নাজ।

জন্ম ও ক্রিকেটের পাঠ

১৯৯৩ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে জন্ম নেন প্রিয়নাজ। ক্রিকেটের যাবতীয় পাঠও নিয়েছেন সেখানেই। ২০১২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কটল্যান্ড ক্রিকেটের সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ২০১৮ সালে দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক ঘটে এই অলরাউন্ডারের। স্কটল্যান্ডের হয়ে ইতিমধ্যেই ২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। শুধু জাতীয় দলই নয়, অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ঘরোয়া টুর্নামেন্ট ‘বিগ ব্যাশ লিগ’-এও (WBBL) খেলার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।

শিক্ষাগত ও পারিবারিক ঐতিহ্য

ক্রিকেট মাঠের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও সমান পারদর্শী প্রিয়নাজ। তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপটও বেশ নজরকাড়া। তাঁর বাবা মনোজিৎ চট্টোপাধ্যায় ১৯৫১ সালে মুম্বইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। দিল্লি এবং এলাহাবাদে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। পরবর্তীতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সান্নিধ্যে ক্লাস করার সুযোগও হয়েছিল তাঁর। শিক্ষা জীবন শেষে ডান্ডি এবং এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে অধ্যাপনা করেন মনোজিৎবাবু। মনোজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও অঞ্জুম রহমতুল্লার সুযোগ্য কন্যা হলেন প্রিয়নাজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর প্রিয়নাজ অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ‘পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া’ (Western Australia) দলের হয়ে শীর্ষস্তরে ক্রিকেট খেলেন। বর্তমানে খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি লন্ডনের ‘এলিমেন্ট এনার্জি’ নামক একটি সংস্থায় স্ট্র্যাটেজি বিশেষজ্ঞ (কৌশলগত বিশেষজ্ঞ) হিসেবে কর্মরত।

ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা

২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কাউন্টি ক্লাব সারে-তে যোগ দিয়ে টানা তিনটি মরসুম খেলেন প্রিয়নাজ। এরপর নিউজিল্যান্ডে পাড়ি দিয়ে ঘরোয়া রাজ্য দল ‘ওয়েলিংটন ব্লেজ’-এর হয়ে মাঠ কাঁপান। এর পাশাপাশি স্কটল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটেও তিনি অত্যন্ত নিয়মিত মুখ।

বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে উচ্ছ্বসিত প্রিয়নাজ বলেছিলেন:

“নিজের দেশের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি মঞ্চে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে চলেছি, যা নিয়ে আমরা সবাই দারুণ উত্তেজিত। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যরা সরাসরি খেলা দেখতে আসতে পারবেন। দল হিসেবে গত কয়েক বছরে আমরা অনেক উন্নতি করেছি। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলে আমাদের অনেকে যেমন পরিণত হয়েছে, তেমনই স্কটল্যান্ডে থাকা ক্রিকেটারদের খেলার মানও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।”

বিশ্বের নারী ক্রিকেটের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “যোগ্যতা অর্জন পর্ব খেলার সময় আমরা বুঝতে পেরেছি যে বিশ্বজুড়ে মহিলাদের ক্রিকেটের কতটা জোয়ার এসেছে। বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ হবে না এবং এখানে অনেক অঘটনও দেখতে পাওয়া যেতে পারে।”

বাঙালি পরিবারের এই কৃতী সন্তান বিশ্বমঞ্চে স্কটল্যান্ডের হয়ে কতটা সফল হন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.