সফর শেষে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী: মেলোনির সাথে কৌশলগত বৈঠক, উপহার বিভ্রাটে উত্তাল শেয়ার বাজার ও ঘরোয়া রাজনীতি

সফর শেষে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী: মেলোনির সাথে কৌশলগত বৈঠক, উপহার বিভ্রাটে উত্তাল শেয়ার বাজার ও ঘরোয়া রাজনীতি

সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে সফর শেষে নিজের ছয় দিনের বিদেশ সফরের পঞ্চম তথা শেষ গন্তব্য ইটালিতে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজধানী রোমের ভিলা ডোরিয়া পামফিলিতে ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে তাঁর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মতো একাধিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের সমাপতন ঘিরে একদিকে যেমন রোমের উপহারের ‘নাম বিভ্রাটে’ মুম্বইয়ের শেয়ার বাজারে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনই দেশে ফেরার মুখে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ‘গদ্দার’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের ঘরোয়া রাজনীতি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সাথে ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এটাই ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রথম ইউরোপ সফর, যার অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আমেরিকার ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা হ্রাস করা। এর আগে ২০২৪ সালের জুনে জি৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ইটালিতে এসেছিলেন তিনি।

মেলোনি-মোদী বৈঠক: ২০২৯ সালের মধ্যে ২.২৫ লক্ষ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্য

ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইটালির কৌশলগত সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। ইউক্রেন সংঘাত, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীর সংকট নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:

  • বাণিজ্যিক লক্ষ্যমাত্রা: ২০২৩ সালে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪০০ কোটি ইউরো। ২০২৯ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে ২০০০ কোটি ইউরোয় (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি) নিয়ে যাওয়ার যৌথ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে।
  • প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ গবেষণা এবং অসামরিক পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে ‘ভারত-ইতালি ইনোভেশন সেন্টার’ গড়ে তোলার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদী।
  • প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব: সমুদ্র-যুদ্ধের উপযোগী আধুনিক অস্ত্র, হেলিকপ্টার, নৌ-প্ল্যাটফর্ম এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে যৌথ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
  • অর্থনৈতিক করিডর: দুই দেশই ‘ভারত-পশ্চিম এশিয়া-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ (IMEC)-এ পারস্পরিক সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। এছাড়া, ছাত্র ও দক্ষ কর্মীদের যাতায়াত সহজ করতে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন মেলোনি।

উল্লেখ্য, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরেও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ত্রাণসামগ্রী পরিবাহী গাজাগামী জাহাজ আটকে দেওয়ার ঘটনায় ইজরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।

‘পার্লে মেলোডি’ চকোলেট বিভ্রাটে দালাল স্ট্রিটে হইচই

দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী মোদী ইটালির প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের সুপরিচিত ‘পার্লে মেলোডি’ চকোলেট উপহার দেন। মেলোনি সেই উপহারের একটি ১২ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন, “রোমে স্বাগত, আমার বন্ধু!”

এই ভিডিওটি ভারতীয় সময় বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে পোস্ট হওয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই মুম্বইয়ের শেয়ার বাজারে এক অভূতপূর্ব বিভ্রান্তি তৈরি হয়। লগ্নিকারীরা হুজুগে পড়ে তড়িঘড়ি ‘পার্লে ইন্ডাস্ট্রিজ’ (Parle Industries)-এর শেয়ার কেনা শুরু করেন, যার ফলে হু হু করে বাড়তে থাকে সংস্থাটির শেয়ারের দাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই শেয়ার বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে সমনামী বিভ্রান্তি।

প্রকৃত তথ্য: শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ‘পার্লে ইন্ডাস্ট্রিজ’ মূলত রিয়্যাল এস্টেট, পরিকাঠামো এবং কাগজ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার ব্যবসার সাথে যুক্ত। অন্যদিকে, মেলোডি চকোলেট প্রস্তুতকারী সংস্থাটি হলো ‘পার্লে প্রোডাক্টস’ (Parle Products), যা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তই নয়। নামের এই মিল থাকার কারণেই লগ্নিকারীদের ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয় দালাল স্ট্রিট।

রাহুল গান্ধীর ‘গদ্দার’ কটাক্ষ ও রাজনৈতিক তরজা

প্রধানমন্ত্রীর এই বিদেশ সফর এবং চকোলেট উপহারের ঘটনাটিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র রায়বরেলীর এক জনসভায় আরএসএস ও বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করে তিনি বলেন:

“এরপর কোনো আরএসএস নেতা আপনাদের বাড়ি এসে নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহের কথা বললে তাঁদের পাল্টা বলুন— আপনাদের প্রধানমন্ত্রী গদ্দার, আপনাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গদ্দার, আরএসএস গদ্দার। আপনারা ভারত বিক্রির কাজ করছেন, সমস্ত স্বশাসিত সংস্থা, সংবিধান, অম্বেডকর ও মহাত্মা গান্ধীকে আক্রমণ করছেন।”

পাশাপাশি নিজের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে মোদীকে কটাক্ষ করে রাহুল লেখেন, দেশের মানুষ যখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কৃষক-যুবক-শ্রমিকদের চোখে যখন জল, তখন প্রধানমন্ত্রী ইটালিতে হাসিমুখে রিল বানাচ্ছেন এবং চকোলেট বিলি করছেন। একে তিনি ‘নেতৃত্ব নয়, প্রহসন’ বলে অভিহিত করেন।

রাহুল গান্ধীর এই ‘গদ্দার’ মন্তব্যের পর ‘প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা’র অভিযোগ তুলে পাল্টা রাজনৈতিক প্রচারে নেমেছে বিজেপি। একই সাথে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে রাহুল গান্ধীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনাকারী দল নরওয়ের পতাকার বদলে ভুলবশত সুইডেনের পতাকা ব্যবহার করেছে। সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর সমাপ্তির লগ্নেও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংঘাতের পারদ তুঙ্গে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.