যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বহিরাগতদের হামলা, ছাত্রসংঘর্ষ এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনার প্রেক্ষিতে এক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে এই তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এর পাশাপাশি, ক্যাম্পাসে হিংসা ছড়ানো ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করার অভিযোগে যাদবপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দিনভর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার সময় এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক কর্তাদের অনুপস্থিতি এবং গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগরে দেন আন্দোলনকারীদের একাংশ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর কর্তৃপক্ষ জানান, তদন্ত কমিটির হাতে গোটা ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ তুলে দেওয়া হবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারও গাফিলতি প্রমাণ হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ক্যাম্পাসে শান্তি ও স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে আগামী সোমবার বিকেল ৩টেয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে এক সর্বদলীয় বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত ও রাজনৈতিক পারদ
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, গত কয়েক মাস ধরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হচ্ছিল। রামনবমীর পুজো থেকে শুরু করে অরবিন্দ ভবনে যাগ্যজ্ঞ—বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহ তৈরি হয়।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বুধবার রাতে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ‘ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ (FETSU)-এর সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে বাম ও দক্ষিণপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির মধ্যে বিবাদ চরম আকার নেয়। সাধারণ সভা চত্বরে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে এবং মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে বহিরাগতেরা তাণ্ডব চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনার সময় বামপন্থীদের পতাকা জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং শিশুশিক্ষা কেন্দ্র ‘আশু-তিমিরের পাঠশালা’ ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
উভয় পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগ ও দাবি
সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষেরই একাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। বুধবার রাতে আহত দক্ষিণপন্থী ছাত্রদের দেখতে হাসপাতালে যান যাদবপুর অঞ্চলের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। একই সাথে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) যাদবপুর থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শর্বরী মুখোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, এলাকায় সারারাত তাণ্ডব চলেছে।
এবিভিপি-র কেন্দ্রীয় কর্মসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারীর দাবি, “অতিবাম ও দিমাগি নকশালেরা দলিত শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।” এবিভিপি নেতা নিখিল দাসের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে, দর্শন বিভাগের ছাত্র তথা ‘রেভিউলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্ট’ (RSF)-এর সদস্য অভিনব দাসের পাল্টা দাবি, ফেটসুর সাধারণ সভায় এবিভিপি এবং এনএসএফ (NSF) বহু বহিরাগতকে নিয়ে এসে মারধর শুরু করে। তিনি জানান, নিখিল দাস, দীপ্তিমান কর ও সোমসূর্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হামলায় অস্মিত সিংহ ও সায়ক মণ্ডলসহ বহু বামপন্থী ছাত্র আহত হন। বাম সংগঠনগুলির অভিযোগ, বহিরাগতদের সহায়তায় কলা, বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পড়ুয়াদের তাড়া করে অরবিন্দ ভবনে আটকে রাখা হয়, ক্যাম্পাসে আগুন জ্বালানো হয় এবং ইট-পাটকেল ছুঁড়ে গণপিটুনির চেষ্টা করা হয়।
বাম ছাত্রসংগঠনগুলির আরও দাবি, বুধবার রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি এবং একাধিক মন্ত্রীর উপস্থিতির সময় থেকেই ক্যাম্পাসে ‘রেকি’ চালানো হচ্ছিল, অর্থাৎ এই হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। অন্যদিকে এবিভিপি-র পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানানো হয়, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যেখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধিত ছাত্রসংগঠন থাকার কথা নয়, সেখানে কীভাবে ফেটসুর সাধারণ সভা ডাকা হলো, তা নিয়েই তারা প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
বৃহস্পতিবারের তাণ্ডব ও পুলিশের ভূমিকা
বৃহস্পতিবার দিনভর দুটি বিপরীতমুখী মিছিলকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যারিকেড গড়লেও এবিভিপি-র একটি মিছিল ব্যারিকেড ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের সামনে পৌঁছে যায়।
অভিযোগ উঠেছে, বন্ধ ফটকের বাইরে থেকে ভেতরে বোতল ও পাথর ছোড়া হয় এবং মূল ফটকে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাতব প্রতীকটি ভেঙে ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাধারণ পড়ুয়াদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও এসএফআই (SFI) ও এবিভিপি সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও ধাক্কাধাক্কি চলতে থাকে। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ফটক ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে এসএফআই সমর্থকদের ধস্তাধস্তি হয়। ঘটনায় সিপিআইএম (CPIM) নেত্রী দীপ্সিতা ধর অভিযোগ করেন, “কোনো মহিলা পুলিশ কর্মী না থাকা সত্ত্বেও আমার গায়ে হাত তোলা হয়েছে।”
অন্যদিকে, পুলিশের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন এবিভিপি নেতা শুভ্রব্রত অধিকারী। তিনি বলেন, “যাদবপুর আমরা যাবই! দিনে আটকাবে তো রাতে যাব, রাতে আটকাবে তো ভোরে যাব। বিজেপি-র সঙ্গে এবিভিপি-র কোনও সম্পর্ক নেই। পুলিশ বাধা দিচ্ছে, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। পুলিশের ১৫ বছরের চটি চাটার অভ্যাস ধীরে ধীরে ছাড়বে।”

