ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুর দাবিতে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত অনলাইনে পঠনপাঠন চালানোর নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখা এবং ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত রবিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাজ়হার আসিফ, রেজিস্ট্রার মহম্মদ মেহতাব আলম রিজ়ভি এবং পরীক্ষা নিয়ামক এহতেশামুল হক-সহ শীর্ষ আধিকারিকদের বৈঠক হয়। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সিনিয়র ডিন ও অধ্যাপকদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটি পড়ুয়াদের দাবিগুলি পর্যালোচনা করবে এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করবে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান প্রশাসন প্রায় দুই দশকের অচলাবস্থা কাটাতে বদ্ধপরিকর বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
২০০৬ সালে ক্যাম্পাসে ব্যাপক হিংসা, শিক্ষকদের উপর হামলা এবং পঠনপাঠন ব্যাহত হওয়ার ঘটনার পর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (জেএমআইএসইউ) ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় দু’দশক পর ছাত্র সংসদ পুনরায় চালুর দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়াদের একাংশ। আন্দোলনের অংশ হিসেবে পাঁচ জন পড়ুয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনেও বসেন।
অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের অস্থায়ী তাঁবু সরিয়ে দিতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পড়ুয়াদের বচসা শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষের চেহারা নেয়। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা-র অভিযোগ, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর কোনও প্ররোচনা ছাড়াই অনশনরত পড়ুয়াদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাঁদের উপর জোরজুলুমও চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
তিন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ ঘিরে বাড়ল উত্তেজনা
আন্দোলনের মধ্যেই গত শুক্রবার তিন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভ চলাকালীন বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগে আইন বিভাগের পড়ুয়া এবিন বেসিলকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। জসিম খান ও মহম্মদ ইলমান নামে আরও দুই পড়ুয়াকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তিন জনের উপরেই এক বছরের জন্য ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। ‘জামিয়া স্টুডেন্টস ফর স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’-এর তরফে অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার এবং তাঁদের উপর জোরজুলুমের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ প্রক্টরের পদত্যাগও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে কী যুক্তি প্রশাসনের?
পড়ুয়াদের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রশাসনের যুক্তি, ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্টও ক্যাম্পাসে অতীতের হিংসার ঘটনাগুলি বিবেচনা করে ছাত্রভোট করানোর কোনও নির্দেশ দেয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, পড়ুয়াদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিভাগ ও কেন্দ্রে বিষয়ভিত্তিক নির্বাচন বা ‘সাবজেক্ট অ্যাসোসিয়েশন ইলেকশন’ চালু রয়েছে। এই নির্বাচনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রশাসনের মতে, পড়ুয়াদের প্রতিনিধিত্বের জন্য এই ব্যবস্থাই বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রেজিস্ট্রারের
ক্যাম্পাসের অশান্তির জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহম্মদ মেহতাব আলম রিজ়ভি। তাঁর অভিযোগ, আগের দিন কংগ্রেস সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ি এবং ইমরান মাসুদ পাঁচিল টপকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করেন। সেখানে পড়ুয়াদের উস্কানি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
রেজিস্ট্রারের অভিযোগ, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে পড়ুয়াদের ব্যবহার করছেন ওই দুই সাংসদ। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
দেওয়ালে স্লোগান ঘিরে নতুন বিতর্ক
ছাত্র আন্দোলনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেওয়ালে জম্মু ও কাশ্মীর সংক্রান্ত ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান লেখার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এই ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিজেপি।
অন্য দিকে, গত ২১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকে চিঠি দিয়েছেন সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস। জামিয়া ক্যাম্পাসে প্রায় দুই দশক ধরে কোনও নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। চিঠিতে সংবিধানপ্রদত্ত বাক্স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-র নির্দেশিকা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে লিংডো কমিটির সুপারিশের কথাও উল্লেখ করেছেন।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক অশান্তি—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। সাত সদস্যের কমিটি আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা কাটাতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে। আপাতত অনলাইনে পঠনপাঠন চালানোর সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষাক্রম কবে ফিরবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

