কালীঘাটে জোড়া ধাক্কা: বালু ও নরেন্দ্রনাথের ইস্তফা, ঋতব্রতের শিবিরে বাড়ছে ভিড়

কালীঘাটে জোড়া ধাক্কা: বালু ও নরেন্দ্রনাথের ইস্তফা, ঋতব্রতের শিবিরে বাড়ছে ভিড়

শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা— দফায় দফায় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ল কালীঘাট। দলের সাংগঠনিক রদবদলের রেশ কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের ছবি স্পষ্ট হলো। সকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু) দল ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে চিঠি পাঠানোর পর, বিকেলে পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন পাণ্ডবেশ্বরের প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

শারীরিক কারণ দর্শিয়ে ইস্তফা

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠিতে তাঁর মধুমেহ (ডায়াবেটিস) রোগের কারণে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। অন্যদিকে, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও তাঁর ইস্তফাপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথাই উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, চব্বিশের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সাংগঠনিক রদবদল করেছিলেন, তাতে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে জাতীয় কর্মসমিতিতে রাখা হয়েছিল এবং নরেন্দ্রনাথকে পশ্চিম বর্ধমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

ঋতব্রতের শিবিরে হেভিওয়েটদের তৎপরতা

শারীরিক অসুস্থতার কথা বলা হলেও, রাজনৈতিক সমীকরণ অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক সশরীরে উপস্থিত না হলেও, শুক্রবার বিকেলে বিদ্রোহী নেতা তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেন নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। সেখানে ঋতব্রতের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি।

নরেন্দ্রনাথের পাশাপাশি এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কান্দির প্রাক্তন বিধায়ক অপূর্ব সরকার (ডেভিড) এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মলয় ঘটকের ভাই অভিজিৎ ঘটক। সাম্প্রতিক রদবদলে মলয় ঘটককে শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাঁর ভাইয়ের এই পদক্ষেপ কালীঘাটের জন্য বড় ধাক্কা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। শুধু তাই নয়, চিকিৎসক ফ্রন্টে মমতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত নেতা হিসেবে পরিচিত নির্মল মাজিও শুক্রবার ঋতব্রতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তহবিল নিয়ে চাপ বাড়ানোর কৌশল রাজনৈতিক মহলের মতে, একদিকে যেমন একের পর এক হেভিওয়েট নেতা ঋতব্রতের শিবিরে যোগ দিচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনই দলীয় তহবিল সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে শাসক শিবিরের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে বিদ্রোহী ব্লক। এই জোড়া ফলা কালীঘাটের অস্বস্তি ও রক্তচাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

“ঐক্যবদ্ধ মানুষের জয় সুনিশ্চিত”

শুক্রবার সন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও অপূর্ব সরকারকে পাশে নিয়ে এক সাংবাদিক বৈঠক করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি স্পষ্ট জানান, ‘‘আমরা কোনো ব্যক্তির বদলে সমষ্টির লড়াই করছি।’’

বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা ঋতব্রত তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই লাতিন আমেরিকার একটি বিখ্যাত প্রতিবাদী গানের লাইন উদ্ধৃত করে বলেন, ‘‘এল পুয়েব্লো ইউনিডো, জামাস এরা ভেনসিডো’’— যার অর্থ, ‘ঐক্যবদ্ধ মানুষের জয় সুনিশ্চিত।’ ভবিষ্যতে এই বিদ্রোহী শিবির সাধারণ মানুষকে কতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে তা সময় বলবে, তবে আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন ধরাতে তাঁরা যে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ, শুক্রবারের ঘটনায় তা কার্যত স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.