বিশ্বসেরা হলেও পেনাল্টিতে ‘মাঝারি’ মেসি: অস্ট্রিয়া ম্যাচে ব্যর্থতার পর আলোচনায় মহাতারকার রান-আপ কৌশল

বিশ্বসেরা হলেও পেনাল্টিতে ‘মাঝারি’ মেসি: অস্ট্রিয়া ম্যাচে ব্যর্থতার পর আলোচনায় মহাতারকার রান-আপ কৌশল

রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে চার-চারটি বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী লিওনেল মেসিকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা হিসেবে গণ্য করা হয়। মাঠের খেলা তৈরি করা, গোল করা কিংবা নিখুঁত পাসের জাদুতে তাঁর বাঁ পায়ের জুড়ি মেলা ভার। তবে এতসব আকাশছোঁয়া সাফল্যের মাঝেও পেনাল্টি স্পটে আর্জেন্টিনার এই মহাতারকার পরিসংখ্যান অত্যন্ত সাধারণ মানের। সোমবার রাতে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর পেনাল্টি মিসের ঘটনা সেই পুরোনো দুর্বলতাকেই যেন আরও একবার সামনে নিয়ে এল।

পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত মোট সাতটি পেনাল্টি নিয়েছেন মেসি, যার মধ্যে তিনবারই তিনি গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের হালডরসন এবং ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের গোলকিপার উজসিয়েচ সেজেনি মেসির পেনাল্টি রুখে দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল জীবনে ৩১টি পেনাল্টির মধ্যে ২৫টিতে গোল করেছেন তিনি। আর ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে মোট ১৪৯টি পেনাল্টির মধ্যে তাঁর গোল সংখ্যা ১১৬টি। অর্থাৎ, পেনাল্টি স্পটে মেসির সাফল্যের হার মাত্র ৭৭ শতাংশ, যা তাঁর মানের একজন বিশ্বসেরা ফুটবলারের ক্ষেত্রে বেশ নজরকাড়া রকমের কম।

অস্ট্রিয়া ম্যাচে কী ঘটেছিল?

সোমবারের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার স্লাগারের সঙ্গে মানসিক লড়াইয়ে কার্যত হেরে যান মেসি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর সিদ্ধান্তের কারণে শট নেওয়ার আগে প্রস্তুতির জন্য প্রায় পাঁচ মিনিট সময় পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ছোট রান-আপে দৌড়ে এসে শট নেওয়ার শেষ দুটি ধাপের আগে মেসি নিজের গতি কমিয়ে দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গোলকিপার স্লাগার কোন দিকে ঝাঁপ দিচ্ছেন তা দেখে নেওয়া। কিন্তু অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের জায়গায় সোজা দাঁড়িয়ে থাকেন। শেষ মুহূর্তে গোলকিপারের কোনো নড়াচড়া বুঝতে না পেরে মেসি একটি দিকে শট মারেন এবং বল পোস্টের বাইরে চলে যায়। স্লাগার অবশ্য সঠিক দিকেই ঝাঁপিয়েছিলেন।

মেসির পেনাল্টি কৌশলের বিবর্তন ও ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর বিশ্লেষণ

ক্রীড়া সাময়িকী ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ গায়ের জোডেটের মতে, আধুনিক গোলকিপাররা এখন পেনাল্টি শুটারদের মনস্তত্ত্ব ও কৌশল পুরোপুরি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা জানেন যে হ্যারি কেন, রবার্ট লেভানডভস্কি বা জর্জিনহোর মতো ফুটবলাররা রান-আপের সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন গোলকিপারের নড়াচড়া বোঝার জন্য। গোলকিপার সামান্য হেলে গেলেই তাঁরা উল্টো দিকে বল ঠেলে দেন।

  • কেরিয়ারের শুরু বনাম বর্তমান কৌশল: কেরিয়ারের শুরুতে (যেমন ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে) মেসি দ্রুত গতিতে ছোট রান-আপ নিয়ে কোণাকুণি সাধারণ শটে সহজেই গোল করতেন। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে তাঁর কৌশলে পরিবর্তন আসে। তিনি শট নেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে থমকে গিয়ে গোলকিপারকে পড়ার চেষ্টা করেন (Goalkeeper-dependent technique)।
  • সাফল্য ও ব্যর্থতার তারতম্য: কাতার বিশ্বকাপে মেসির সাতটি পেনাল্টির মধ্যে ছয়টি সফল হওয়ার কারণ ছিল, শট নেওয়ার আগেই গোলকিপাররা যেকোনো একদিকে শরীর ঝুঁকিয়ে ফেলেছিলেন। তবে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে মেসি গোলকিপার ডোমিনিক লিভাকোভিচের নড়াচড়ার তোয়াক্কা না করে গতি ও নিখুঁত উচ্চতার ওপর ভরসা রেখে শক্তিশালী শট মেরেছিলেন এবং সফল হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখনই মেসি গোলকিপারকে বিভ্রান্ত করার কৌশলে যান, তখনই গড়ানো শট বা পানেনকা কিকে তাঁর ব্যর্থতার হার বেড়ে যায়।

বাঁ পায়ের মিথ ও শুটআউটের রেকর্ড

ফুটবল মহলে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে ডান পায়ের তুলনায় বাঁ পায়ের ফুটবলাররা পেনাল্টিতে দুর্বল হন এবং মেসিও এর ব্যতিক্রম নন। তবে পরিসংখ্যান এই তত্ত্বকে খণ্ডন করে। বিশ্ব ফুটবলে প্রতি ৫ জনে মাত্র ১ জন ফুটবলার বাঁ পায়ের হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাঁ পায়ে পেনাল্টির সংখ্যা কম। ডান পায়ের ফুটবলারদের আধিক্য বেশি থাকায় গোলকিপারদের পক্ষে তাঁদের শটের দিক অনুমান করা কঠিন হয়, যা বাঁ পায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সহজ।

তবে ম্যাচ চলাকালীন পেনাল্টি মিসের খতিয়ান দীর্ঘ হলেও, টাইব্রেকার বা ‘পেনাল্টি শুটআউট’-এর ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির রেকর্ড বেশ ভালো। দেশের হয়ে ৯ বার শুটআউটে শট নিতে গিয়ে ৭ বারই সফল হয়েছেন তিনি। কেবল ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে এবং ২০২৪-এ ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে শুটআউটে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

পেনাল্টিতে খামতি থাকলেও ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, লিওনেল মেসির মতো একজন ফুটবলারকে কেবল পেনাল্টির খতিয়ান দিয়ে বিচার করা অসম্ভব। পেনাল্টি স্পটে একাধিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও, আর্জেন্টিনা বা ক্লাব দল— মাঠের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে দলের প্রথম এবং প্রধান ভরসার নাম আজও লিওনেল মেসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.