বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠনগুলোর লাগাতার হুমকি, উস্কানি ও প্রতিবাদের জেরে এপার বাংলার গাইবান্ধা জেলায় দেশের বৃহত্তম রাম মূর্তি নির্মাণের কাজ মাঝপথেই বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এভাবে প্রকল্প থমকে যাওয়ার ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যার আঁচ এবার আছড়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকার রাজপথেও।
প্রকল্প প্রেক্ষাপট ও মৌলবাদী তৎপরতা
বাংলাদেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রাধা গোবিন্দ মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ মন্দির কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলছিল। এই প্রকল্পের মূল আকর্ষণ ছিল একটি ৮১ ফুটের রাম মূর্তি। নির্মাণ সম্পন্ন হলে এটিই হতো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাম মূর্তি। এর পাশাপাশি ৫০ ফুটের শ্রীকৃষ্ণ এবং ৩০ ফুটের শিব মূর্তি তৈরির পরিকল্পনাও ছিল মন্দির কমিটির।
বিগত এক বছর ধরে চলা এই মূর্তির সিংহভাগ কাজ শেষ হয়ে গেলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কট্টরপন্থী ইসলামি প্রচারকদের কিছু উস্কানিমূলক ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে মূর্তিটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়। এরপর গাইবান্ধায় কট্টরপন্থীদের একটি মিছিল থেকে শ্রী রামের ছবিতে জুতো ছুঁড়ে অবমাননা করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই চরম আতঙ্কের আবহে ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলা’ বজায় রাখার দোহাই দিয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষ আপাতত নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ঝড় ও শাহবাগ অবরোধ
রাম মূর্তির অবমাননা এবং কাজ বন্ধের প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলনে নেমেছে ওপার বাংলার ছাত্র সমাজ। মূর্তি অবমাননাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং অবিলম্বে নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবং ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদ একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করে।
বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢাকার ব্যস্ততম শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট বক্তব্য, “এদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শ্রী রামের এই অবমাননা সনাতনীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে।”
তারেক রহমান সরকার ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকার কর্মীরা। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ১৩৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিপূর্বে ঘোষণা করেছিলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”। তবে সরকারের এই আশ্বাসের পরেও প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হওয়া একটি ধর্মীয় মূর্তির কাজ কেন বন্ধ করতে হলো, তা নিয়ে সরব হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়। নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনও এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে এটিকে ‘তালিবানি মানসিকতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন
এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেই নয়াদিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কের পারদও ক্রমশ চড়ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে তাঁর অতীত ভারত-বিরোধী মন্তব্যের জেরে দিল্লির বিমানবন্দরে ভারতীয় অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। এই ‘অপমানের’ প্রতিবাদে তিনি ভারতের সফর বাতিল করেন এবং ঢাকা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে কড়া কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়।
এমনকি, পূর্বতন শেখ হাসিনা সরকারের আমলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ‘আম কূটনীতি’ (ভারতীয় শীর্ষ নেতাদের আম উপহার পাঠানো) এবার বন্ধ করে দিয়েছে তারেক রহমান সরকার। ভারতের পরিবর্তে এবার নেপালে আম পাঠিয়েছে ঢাকা। সার্বিক পরিস্থিতিতে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে এক ধরণের ঠাণ্ডা লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

