সুরের জাদুকরী আশা ভোসলে: এক নশ্বর মানবী ও অবিনশ্বর মোহের মহাপ্রয়াণ

সুরের জাদুকরী আশা ভোসলে: এক নশ্বর মানবী ও অবিনশ্বর মোহের মহাপ্রয়াণ

আটের দশকের এক হিমেল রাত। কলকারখানা ঘেরা মফস্‌সলের এক বিচিত্রানুষ্ঠানে কৃত্রিম ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঠেলে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন এক শিল্পী। মাইকে ভেসে এল, ‘রাত বাকি, বাত বাকি…’। সেই রাতে বলিউডের গ্ল্যামার থেকে সহস্র যোজন দূরে থাকা এক শ্রমজীবী মানুষের দল দেশি মদের গন্ধ আর বিড়ির ধোঁয়ার মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলেন এক পরাবাস্তব জগত। সেই জগতের নেপথ্যে ছিলেন এক কিন্নরকণ্ঠী মানবী— আশা ভোসলে। আজ ৯২ বছর বয়সে সেই সুরের জাদুকরীর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক মহাবৈচিত্রময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

সংগ্রাম ও সাফল্যের জয়যাত্রা

১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে জন্ম আশার। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগের পর পরিবারের হাল ধরতে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে পাড়ি জমান মুম্বইয়ে। ১৯৪৩ সালে মরাঠি ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক এবং ১৯৪৮-এ হিন্দি ছবিতে হাতেখড়ি। সেই সময় ইন্ডাস্ট্রিতে শামসদ বেগম, গীতা দত্ত ও লতা মঙ্গেশকরের দাপট। বড় বাজেটের ছবির দরজা তখন আশার জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু ১৯৫২ সালে ওপি নাইয়ারের সুরে ‘ছম ছমাছম’ গানটি তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ‘নয়া দৌড়’, ‘গুমরাহ’ এবং ‘হমরাজ’— একের পর এক সফল গান তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়।


রাহুলের গবেষণাগারে ‘বুনসেন বার্নার’

আশা ভোসলের সঙ্গীত জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাহুল দেব বর্মণের (আরডি বর্মণ) সঙ্গে। তাঁদের জুটি ছিল বৈপ্লবিক। রাহুল যখন হিন্দি গানের ব্যাকরণ বদলে সুইং, রক অ্যান্ড রোল বা ডিস্কো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন, তখন আশা ছিলেন সেই গবেষণাগারের প্রজ্জ্বলিত শিখা। ‘তিসরি মঞ্জিল’-এর গান থেকে শুরু করে ‘দম মারো দম’— আশার কণ্ঠ ভারতীয় শ্রোতাদের কাছে এক নতুন আধুনিকতার স্বাদ নিয়ে এসেছিল।

আশার বহুমুখী প্রতিভা এক নজরে:

  • ডিস্কো ও ক্যাবারে: ‘পিয়া তু আব তো আ যা’ বা ‘লায়লা ম্যাঁয় লায়লা’।
  • গজল: ‘উমরাও জান’ ছবিতে ‘ইন আখোঁ কি মস্তি’ বা ‘দিল চিজ ক্যা হ্যায়’ গেয়ে প্রমাণ করেছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর গভীরতা।
  • জাতীয় পুরস্কার: রাহুলের সুরে ও গুলজারের কথায় ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।
  • আধুনিক যুগের মেলবন্ধন: এআর রহমানের সুরে ‘রঙ্গিলা’ ছবিতে ৬২ বছর বয়সেও ‘তন্‌হা তন্‌হা’ গেয়ে নতুন প্রজন্মকে মাত করেছিলেন তিনি।

বাঙালির হৃদয়ে আশার আসন

বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আশা ভোসলে কেবল একজন হিন্দি গায়িকা ছিলেন না। রাহুল দেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী বা সুধীন দাশগুপ্তের সুরে তাঁর গাওয়া বাংলা গানগুলো আজও পুজোর প্যান্ডেলে অপরিহার্য। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ বা ‘আজ যাই, আসব আরেক দিন’-এর মতো গানগুলো আজও অমলিন। এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তিনি রেখেছেন তাঁর স্বকীয়তার স্বাক্ষর।

সম্মান ও ব্যক্তিগত জীবন

আশা ভোসলে তাঁর সুদীর্ঘ কেরিয়ারে দাদাসাহেব ফালকে (২০০০), পদ্মবিভূষণ (২০০৮) এবং বঙ্গবিভূষণ (২০১৮) সহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে সর্বোচ্চ সংখ্যক স্টুডিয়ো রেকডিং করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে সাফল্যের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বা রাহুলের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন— বারবার সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে। জীবনের শেষভাগে আলঝাইমার্স থাবা বসিয়েছিল তাঁর শরীরে। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই বিখ্যাত কণ্ঠ।

পুরস্কারের তালিকা:

সম্মানবছর
দাদাসাহেব ফালকে২০০০
পদ্মবিভূষণ২০০৮
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড২০১১
বঙ্গবিভূষণ২০১৮

একটি যুগের অবসান

আজ সেই মোহজাল ছিন্ন করে বিদায় নিলেন আশা। ‘আভি না যাও ছোড় কর’ বলে হাজার আরজি জানালেও সেই কিন্নরকণ্ঠ আর সাড়া দেবে না। ৯২ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি কেবল গান গাননি, তিনি ধারণ করেছিলেন এক আস্ত সময়কে। যে মোহের নাম ‘আশা ভোসলে’, তা হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া হাজার হাজার গান চিরকাল অনুরণিত হবে সুরপিপাসুদের হৃদয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.