দিল্লিতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলার অভিযোগ: তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়ল সুপ্রিম কোর্ট

দিল্লিতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি হামলার অভিযোগ: তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়ল সুপ্রিম কোর্ট

দিল্লিতে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি হামলা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আর সুভাষ রেড্ডির নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবিশঙ্কর ঝা, দিল্লি হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শলিন্দর কৌর, সিবিআইয়ের প্রাক্তন ডিরেক্টর ঋষি কুমার শুক্ল এবং মেঘালয় পুলিশের প্রাক্তন ডিজি এলআর বিশ্নোই।

কমিটির কাজের পরিধি ও মূল বিষয়বস্তু

শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, গত ২০ জুলাই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র সংসদ ভবন অভিযান চলাকালীন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। একই সাথে যন্তর মন্তর ও সংসদ অভিযানকালে মহিলা আন্দোলনকারীদের শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগও তদন্তের আওতায় থাকবে। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশকর্মীদের ওপর পাল্টা হামলা চালানো এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্টের যে পাল্টা অভিযোগ উঠেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

কমিটি ঘটনার সময়কার সিসিটিভি (CCTV) এবং ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করবে। আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা পরিষেবা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি পুলিশ আইনসম্মত ও আনুপাতিক উপায়ে বলপ্রয়োগ করেছিল কি না, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দিল্লি পুলিশের হলফনামা ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

মামলার শুনানিতে দিল্লি পুলিশ সুপ্রিম কোর্টে একটি হলফনামা জমা দিয়ে দাবি করে যে, সিজেপি-র ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়নি এবং পুলিশ আইনবিরুদ্ধ কোনো কাজ করেনি। তবে দিল্লি পুলিশের এই সাফাইয়ে সন্তুষ্ট হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, আদালতের তত্ত্বাবধানে গঠিত এই কমিটি ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগ ও পাল্টা-অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে।

শুনানিকালে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর (FIR) সংক্রান্ত তথ্য সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ। অতীতে অপরাধের রেকর্ড না থাকা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর খারিজের ইঙ্গিত দিয়ে শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ করে, “পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ এবং জীবন ঝুঁকির মুখে—তা মাথায় রাখতে হবে। সংবিধানে স্বীকৃত ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে।”

এর জবাবে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রায় ২,৮০০ জন সমাজবিরোধীকে চিহ্নিত করেছে, যাঁদের অতীতে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে থাকার রেকর্ড রয়েছে এবং ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে অশান্তি ছড়ানোর পেছনে তাঁদের হাত ছিল বলে অভিযোগ।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারির অভিযোগ

সংসদ অভিযানের দিন আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন সিস্টেম’ (Facial Recognition System) বা গণনজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা পুলিশের হলফনামায় ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি সর্বসাধারণের ওপর নজরদারি বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়নি; কেবল পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতেই এটি প্রয়োগ করা হয়েছে।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ শুরু হয়। ২০ জুন থেকে সিজেপি সেখানে ধর্না-বিক্ষোভ শুরু করে এবং ২৮ জুন পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেন। আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের অতিসক্রিয়তা ও নিগ্রহের অভিযোগ তুলে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছিল।

টানা ৩৬ দিনের আন্দোলন শেষে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের পর গত ২৫ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে ধর্না প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সিজেপি নেতৃত্ব। তবে আন্দোলন উঠে গেলেও আদালতের আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত অব্যাহত থাকছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.