অঙ্গদানের মতো একটি মহৎ উদ্যোগে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইতিহাস তৈরির সুযোগ থাকলেও, তা শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হওয়ায় তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও সমাজকর্মীরা। সুন্দরবনের এক মৎস্যজীবী যুবকের ব্রেন ডেথ হওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সম্মতিপত্র এসএসকেএমে পৌঁছানোর পরেও কেন অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হতে রাত ১০টা বেজে গেল, তা নিয়ে বর্তমানে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
গত বুধবার কুলতলির মৈপীঠ এলাকার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সি আজিত মোল্লা বিদ্যা নদী সংলগ্ন কালীবেরার চরে ভাইদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণের শিকার হন। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রতিরোধে বাঘ তাঁকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে যেতে না পারলেও, যুবকের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে ও ঘাড়ের হাড় ভেঙে যায়। এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন থাকার পাঁচ দিন পর চিকিৎসকেরা তাঁর ব্রেন ডেথ ঘোষণা করেন।
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের কর্মী মিঠুন মণ্ডলের তৎপরতায় এবং রোটোর (ROTRO) প্রতিনিধিদের বোঝানোর পর আজিতের স্ত্রী তসলিমা মোল্লা অঙ্গদানে সম্মতি জানিয়ে সই করেন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সেই সম্মতিপত্র নিয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় পরিজনেরা এসএসকেএমে পৌঁছান। কিন্তু সম্মতিপত্র জমা পড়ার দীর্ঘ সময় পরও প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় যুবকের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বুধবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে তাঁর হৃৎপিণ্ড পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।
মৃতের ভাই সমীর মোল্লা ও এপিডিআরের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূরের গলায় এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও আক্ষেপ শোনা গিয়েছে। একটি মুসলিম পরিবার ধর্মীয় বিশ্বাসকে দূরে সরিয়ে এই সামাজিক কাজে এগিয়ে এলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সুন্দরবনের প্রথম অঙ্গদাতা হিসেবে আজিতের নাম নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুরো ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন সমাজকর্মীরা।
অঙ্গ সংগ্রহে এই বিলম্বের নেপথ্যে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও, চিকিৎসকদের একাংশের মতে, বাঘের মতো হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে জলাতঙ্ক বা অন্য কোনো মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়। বাঘের আঁচড় বা কামড় থেকে গ্রহীতার দেহে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকায় যুবকের চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হয়।
অন্যদিকে, যকৃৎ ও কিডনি গ্রহীতার সন্ধানেও দফায় দফায় জটিলতা তৈরি হয়। এসএসকেএমের লিভার বিভাগ (এসডিএলডি) এই যকৃৎ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে আরএন টেগোর হাসপাতাল রাজি হলেও গ্রহীতা পটনার বাসিন্দা হওয়ায় এবং দূরত্বের কারণে বিমান ধরে পৌঁছানোর সমস্যায় শেষ পর্যন্ত তারাও পিছিয়ে আসে। কিডনির ক্ষেত্রেও প্রথমে এসএসকেএমের নিজস্ব তালিকা এবং পরে চিনার পার্ক ও মুকুন্দপুরের বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা ভেস্তে যায়।
চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এমন এক সাধারণ ও উদার মানসিকতার পরিবারের উদ্যোগ সফল না হওয়ায় তাঁদের মধ্যেও গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে নাগপুর বা চণ্ডীগড়ের মতো শহরের পন্থী হয়ে অঙ্গদান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ত্রুটিহীন করার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকমহল। বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৌরভ কোলে জানিয়েছেন, অঙ্গদানের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রক্রিয়াকে আরও কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।

