ভুবনেশ্বরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS) যে রোগীর চিকিৎসা ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই ‘চ্যালেঞ্জ’ সফলভাবে গ্রহণ করে নজির গড়ল কলকাতার নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। দীর্ঘ ১৮ মাসের টানাপড়েন ও জটিল চিকিৎসার পর রাজ্যের প্রথম সরকারি হাসপাতাল হিসেবে ৩২ বছরের এক যুবকের দেহে সফল ‘হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল’ অস্থিমজ্জা (বোন ম্যারো) প্রতিস্থাপন করে দেখাল এনআরএসের হেমাটোলজি বিভাগ।
গত বছর মার্চ মাসে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির বাসিন্দা ব্রজগোপাল কামিল্যাকে নিয়ে এনআরএস হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসেন তাঁর পরিবার। পেশায় বেঙ্গালুরুর পরিযায়ী শ্রমিক ব্রজগোপাল দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং প্রায় নিয়মিত জ্বরে ভুগছিলেন। তাঁর সারা শরীরে কালশিটে দাগ ও মুখের ফ্যাকাশে ভাব দেখে চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়। এর আগে ভুবনেশ্বর এমসে তাঁর অস্থিমজ্জার বায়োপসি করা হলে ‘সিভিয়র অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ ধরা পড়ে। এটি রক্তের এমন একটি মারাত্মক রোগ, যেখানে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত পরিমাণে নতুন রক্তকণিকা তৈরি করতে ব্যর্থ হয় এবং কোষের সংখ্যা কমে তার বড় অংশে ফ্যাট টিস্যু তৈরি হয়। এর ফলে রোগীর প্রাণসংশয় পর্যন্ত হতে পারে।
রোগীকে সুস্থ করে তুলতে এনআরএসের হেমাটোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রধান বাধা ছিল দাতা ও গ্রহীতার স্টেম সেলের জিনের মিল থাকা। ব্রজগোপালের সঙ্গে তাঁর ৪৪ বছর বয়সি দাদা শঙ্কর কামিল্যার স্টেম সেলের মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ (১০টির মধ্যে ৫টি এইচএলএ জিন) মিল পাওয়া যায়। জিনের এই তারতম্যের কারণে এই ধরনের ‘হ্যাপলো ট্রান্সপ্ল্যান্ট’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হয়, যার বেসরকারি হাসপাতালের খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসক সন্দীপ সাহার নেতৃত্বে হেমাটোলজি বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লড়াই চালিয়ে যান। প্রতিস্থাপনের আগে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শূন্যে নামিয়ে আনার সময় ‘সাইটোমেগালোভাইরাস’ (CMV) নিষ্ক্রিয় করতে ‘লেটারোমোভির’ নামক অত্যন্ত ব্যয়বহুল ওষুধের প্রয়োজন হয়, যার ৪০ পাতার দাম প্রায় দু’লক্ষ টাকা। স্বাস্থ্য ভবন থেকে এই ওষুধের অনুমোদন আসাতে দেরি হওয়ায় এনআরএস কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগেই স্থানীয়ভাবে সেই জীবনদায়ী ওষুধের ব্যবস্থা করেন। এরপর ব্লাড ব্যাঙ্ক, মাইক্রোবায়োলজি এবং রেডিয়োথেরাপি বিভাগের সমন্বয়ে গত ৩১ জুলাই সফলভাবে ওই যুবকের দেহে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা হয়।
বর্তমানে সুস্থতার পথে থাকা ব্রজগোপালের ১১ মাসের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। এই সাফল্যের পর উচ্ছ্বসিত ব্রজগোপাল জানান, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিপুল খরচ শুনে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই চিকিৎসাসেবা পেয়ে তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন বলে জানান। হেমাটোলজিস্ট প্রান্তর চক্রবর্তী বলেন, বর্তমান একক পরিবারের যুগে নিখুঁত জিন ম্যাচিং পাওয়া কঠিন, ফলে এই ‘হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল’ পদ্ধতি সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

