রাজ্যে সরকার গঠনের পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠকে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের ‘পবিত্রতা’ বজায় রাখার ওপর জোর দিল বিজেপি নেতৃত্ব। শুক্রবার বিধাননগর সেক্টর ফাইভের একটি প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এই বৈঠকে জেলা ও রাজ্য স্তরের পদাধিকারীদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে দলীয় ব্যানারে নেতার ছবির বিন্যাস বদলানোর নজিরবিহীন নির্দেশ দিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
বনসল ও শমীকের কড়া বার্তা: ‘ভুল মাফ, আর নয়’
বৈঠকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল অত্যন্ত কড়া ভাষায় নেতাদের সতর্ক করে বলেন, “এত দিনের সব ভুল মাফ, কিন্তু এর পর থেকে আর নয়।” সাংগঠনিক ফাঁকফোকড় বোজানোর জন্য তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, দলের কেউ যদি অত্যাচার, তোলাবাজি বা অন্য কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তবে দল ‘কঠোর পদক্ষেপ’ করবে। সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে নবনির্বাচিত বিধায়ক— অপরাধ প্রমাণ হলে কেউই ছাড় পাবেন না। শমীক বলেন, এর ফলে যদি দলের বিধায়ক সংখ্যা কিছুটা কমেও যায়, তাতেও দল পিছপা হবে না।
ব্যানারের নতুন বিন্যাস: প্রশাসনের মর্যাদা সবার ওপরে
বিজেপির সাংগঠনিক রীতি অনুযায়ী, দলীয় ব্যানারে একপাশে প্রধানমন্ত্রী ও সর্বভারতীয় সভাপতির ছবি থাকে। অন্য পাশে থাকে রাজ্যের দুই শীর্ষনেতার ছবি। পশ্চিমবঙ্গে এতদিন আগে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং পরে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর ছবি থাকত।
শুক্রবার শমীক ভট্টাচার্য নিজেই এই বিন্যাসে আপত্তি তোলেন। তিনি নির্দেশ দেন, এখন থেকে ব্যানারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি আগে থাকবে এবং রাজ্য সভাপতির ছবি থাকবে পরে।
কেন এই বদল? দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শুভেন্দু অধিকারী এখন আর কেবল দলের নেতা নন, তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে যেমন প্রশাসনিক প্রধান নরেন্দ্র মোদীর ছবি আগে এবং দলীয় সভাপতি নিতিন গডকড়ীর ছবি পরে থাকে, রাজ্যেও সেই মডেল অনুসরণ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শমীক ভট্টাচার্য বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলেও প্রশাসনকে ‘দলদাস’ করা হবে না এবং প্রশাসনের পবিত্রতা রক্ষা করা হবে।
২৫ মে-র মধ্যে কোর কমিটি গঠনের নির্দেশ
সংগঠনকে চাঙ্গা করতে সুনীল বনসল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছেন:
- জেলা কোর কমিটি: আগামী ২৫ মে-র মধ্যে প্রতিটি জেলায় ১৫ জনের কোর কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিতে জেলা সভাপতি, ইনচার্জ ছাড়াও থাকবেন সংশ্লিষ্ট জেলার সাংসদ ও বিধায়করা।
- যৌথ সিদ্ধান্ত: জেলা সভাপতিরা একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কোর কমিটির আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
- সেরা কর্মীদের তালিকা: আসন্ন পুর ও পঞ্চায়েত ভোটের প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিটি জেলাকে অন্তত ১০০ জন ‘সক্ষম’ ও ‘সেরা’ কর্মীর তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাতেই ‘ওজনদার’ বৈঠক সল্টলেকে
দিনভর প্রেক্ষাগৃহে বৈঠকের পর শুক্রবার রাতে সল্টলেকে বিজেপির কার্যালয়ে আর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বসে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় নেতা সুনীল বনসল ও অমিত মালবীয়সহ রাজ্য কোর কমিটির শীর্ষ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে রাতের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ‘ওজনদার’ বৈঠকের আলোচ্য বিষয়বস্তু নিয়ে দলের কোনো নেতাই মুখ খোলেননি।

