ভারতীয় রাজনীতিতে বিনোদন জগতের তারকাদের আগমন নতুন কোনও বিষয় নয়। তবে একুশ শতকে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, এই ‘তারকা-রাজনীতি’ বা ‘সেলিব্রিটি পলিটিক্স’ এক অনন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। জলপাইগুড়ির মেয়ে মিমি চক্রবর্তী ২০০৮ সালে কলকাতায় এসে আশুতোষ কলেজে পড়ার পাশাপাশি মডেলিং ও ছোট পর্দার হাত ধরে অভিনয় জগতে আসেন। ২০১২ সালে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় ‘বাপি বাড়ি যা’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ এবং একই বছর ‘বোঝে না সে বোঝে না’ ছবির সাফল্যে তিনি লাইমলাইটে আসেন। ২০১৯ সালে যাদবপুরের বিদায়ী সাংসদ অধ্যাপক সুগত বসুর পরিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে মাত্র ৩০ বছর বয়সে বিপুল ভোটে সাংসদ নির্বাচিত হন মিমি।
তবে পাঁচ বছরের সংসদীয় মেয়াদে তাঁর উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ২১ শতাংশ এবং তিনি সংসদে মুখ খুলেছিলেন মাত্র ৭ বার। তাঁর মতো অনেক তারকার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সাংসদ পদ বা মেয়াদের অবসানের সাথে সাথেই তাঁদের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনেরও সমাপ্তি ঘটেছে।
টালিগঞ্জ টু কালীঘাট: তারকাপ্রীতির বিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১শে জুলাইয়ের শহিদ দিবসের মঞ্চে টলিউডের তারকাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। রঞ্জিত মল্লিক, সন্ধ্যা রায়, দীপঙ্কর দে, দেব, শতাব্দী রায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তীদের মতো তারকারা ক্রমশ শাসকদলের রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
বাংলার রাজনীতিতে মমতার এই তারকাপ্রীতির সূচনা অবশ্য আরও আগে। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে তিনি প্রার্থী করেছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে এবং চৌরঙ্গী থেকে দাঁড়িয়েছিলেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে আলিপুর উপনির্বাচনে জেতেন অভিনেতা তাপস পাল। ২০০৬-০৮ সালের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় বিনোদন জগতের বহু ব্যক্তিত্ব তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ হন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কবীর সুমন, তাপস পাল ও শতাব্দী রায় এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, দেবশ্রী রায় ও অনুপ ঘোষালদের প্রার্থী করে রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন তৃণমূলনেত্রী।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই তারকানির্ভরতা চরম সীমায় পৌঁছায়। মিঠুন চক্রবর্তীকে রাজ্যসভায় পাঠানোর পাশাপাশি লোকসভায় শতাব্দী, তাপস, মুনমুন সেন, সন্ধ্যা রায় এবং ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা দেবকে প্রার্থী করা হয়। পরবর্তীতে এই তালিকায় যুক্ত হন ইন্দ্রনীল সেন, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জহান, জুন মালিয়া, সোহম চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, রাজ চক্রবর্তী, অদিতি মুন্সী, লাভলি মৈত্র, সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শত্রুঘ্ন সিনহা, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কোয়েল মল্লিকের মতো নাম।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও উপার্জনের ‘বিকল্প’ পথ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারকাদের রাজনীতিতে আনার পিছনে দুটি মূল রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করে:
১. তারকাদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও গ্ল্যামারকে ভোটব্যাঙ্কে রূপান্তরিত করা।
২. যেসব আসনে দলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তীব্র, সেখানে অন্তর্ঘাত এড়াতে ‘অরাজনৈতিক’ বা সেলিব্রিটি মুখ দাঁড় করিয়ে দেওয়া।
অন্য দিকে, পেশাগত দিক থেকে ছবির বাজার মন্দা থাকার কারণে অনেক তারকার কাছেই রাজনীতি একটি অতিরিক্ত উপার্জনের ও ক্ষমতার ভাগ নেওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। সাংসদ বা বিধায়ক হতে পারলে মাসিক ১ লক্ষ টাকা মূল বেতনের পাশাপাশি একাধিক আকর্ষণীয় সরকারি সুবিধা মেলে:
| পদের ধরন | সুযোগ-সুবিধা ও ভাতাসমূহ |
| বর্তমান সাংসদ | • দেশে বছরে ৩৪ বার নিখরচায় বিমান সফর (নিকটাত্মীয় সহ) • দিল্লির অভিজাত এলাকায় বাংলো অথবা মাসে ২ লক্ষ টাকা বাড়িভাড়া • ট্রেনে প্রথম শ্রেণির কামরায় নিখরচায় ভ্রমণ • নিজের ও পরিবারের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা • বার্ষিক দেড় লক্ষ টাকা ফোন ভাতা |
| প্রাক্তন সাংসদ | • আজীবন পেনশন (নিজের ও নির্ভরশীলদের জন্য) • ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় একজন সঙ্গীসহ বিনামূল্যে যাতায়াত • আজীবন বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা |
এছাড়াও, শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকলে দলীয় নেতাদের পরিচালিত বিভিন্ন মেলা বা ‘মাচা’য় পারফর্ম করার বাড়তি সুযোগ মিলত, যা তাঁদের পেশাগত উপার্জনেও সহায়ক ভূমিকা নিত।
জাতীয় রাজনীতিতে তারকা সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট
স্বাধীন ভারতের প্রথম দশকগুলিতে চলচ্চিত্র জগতের বহু ব্যক্তিত্ব বামপন্থী আদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার মূল উৎস ছিল ‘ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ’ (IPTA)। ১৯৫২ সালের দেশের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে হায়দরাবাদ থেকে সিপিআই (CPI) সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন ‘সোনার কেল্লা’র সিধু জ্যাঠা খ্যাত অভিনেতা-লেখক হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। বলরাজ সাহনি বা এ কে হাঙ্গলরা সরাসরি নির্বাচনে না লড়লেও বামেদের হয়ে প্রচার করতেন। ১৯৬৭ সালে অসমে ভূপেন হাজারিকা এবং ১৯৯৩ সালে কলকাতার চৌরঙ্গী থেকে অনিল চট্টোপাধ্যায় বাম সমর্থিত নির্দল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত তারকাদের নির্বাচনী দাপট মূলত দক্ষিণ ভারতের এমজিআর (MGR) বা এনটিআর (NTR)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
জাতীয় রাজনীতিতে তারকা সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে রাজীব গান্ধীর আমলে। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি এলাহাবাদ থেকে অমিতাভ বচ্চন, বোম্বে থেকে সুনীল দত্ত এবং মাদ্রাজ থেকে বৈজয়ন্তীমালাকে কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড় করান এবং সকলেই জয়ী হন। ১৯৯১ সালে রাজেশ খন্না কংগ্রেসের হয়ে লালকৃষ্ণ আডবাণীর বিরুদ্ধে লড়ে সামান্য ভোটে হারেন এবং পরের বছর দিল্লির উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শত্রুঘ্ন সিনহাকে পরাজিত করেন।
বিজেপিও এই সময়েই ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তারকা-রাজনীতিতে প্রবেশ করে। ১৯৯১ সালে গুজরাত থেকে সাংসদ হন দীপিকা চিখলিয়া (সীতা) এবং অরবিন্দ ত্রিবেদী (রাবণ)। অরুনা গোভিল (রাম) বা দারা সিং (হনুমান) সরাসরি প্রার্থী না হলেও বিজেপির হয়ে ব্যাপক প্রচার করেন। ১৯৯৮-৯৯ সালের পর থেকে দুই শিবিরেই বিনোদ খন্না, ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনী, কিরণ খের (বিজেপি) এবং গোবিন্দ, রাজ বব্বর, নাগমা (কংগ্রেস)-র মতো তারকাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে।
পরিসংখ্যান বনাম সংসদীয় পারফরম্যান্স
তৃণমূলের তারকা সাংসদদের মধ্যে শতাব্দী রায় নিজেকে পূর্ণসময়ের রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। চার মেয়াদের এই সাংসদের সংসদে উপস্থিতির গড় হার বরাবরই ৭০-৭৫ শতাংশের ওপরে এবং তিনি নিয়মিত বিতর্ক ও সংসদীয় আলোচনায় অংশ নেন। তবে অধিকাংশ তারকা প্রার্থীর সংসদীয় খতিয়ান জাতীয় গড়ের (৭৯% উপস্থিতি ও ৪৭টি বিতর্ক) তুলনায় বেশ হতাশাজনক:
- দেব (ঘাটাল): প্রথম দফায় উপস্থিতি ১১% (২টি বিতর্ক), দ্বিতীয় দফায় ১২% (২টি বিতর্ক) এবং তৃতীয় দফায় মাত্র ৮% (কোনও বিতর্ক নয়)।
- মুনমুন সেন (বাঁকুড়া): উপস্থিতি ৬৯% (মুখ খুলেছেন মাত্র ১ বার)।
- সন্ধ্যা রায় (মেদিনীপুর): উপস্থিতি ৫৩% (৩টি বিতর্ক)।
- নুসরত জহান (বসিরহাট): উপস্থিতি ২৩% (১২টি বিতর্ক)।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের রসায়ন
বিজেপি যখন পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের শক্তি বাড়াতে শুরু করে, তারাও রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, বাবুল সুপ্রিয়, বাপ্পি লাহিড়ী, লকেট চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পার্নো মিত্র, পায়েল সরকার, যশ দাশগুপ্ত ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়দের সামনে নিয়ে আসে। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। রাজনৈতিক দল এবং তারকাদের এই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ককে প্রবীণ সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য “বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের ১১ মাসের চুক্তির” সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে কংগ্রেসের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে একদা তাপস পাল মন্তব্য করেছিলেন যে, রাজনীতিতে এলে মিঠুন এক নতুন ‘সাম্রাজ্যের’ নেতা হয়ে উঠতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত তাপসের পথ অনুসরণ করেই টলিপাড়ার বহু শিল্পী দলবদলের অঙ্কে সামিল হন।
তৃণমূলের অন্দরের গুঞ্জন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসার স্বার্থ রক্ষার কারণেই কোয়েল মল্লিকের পরিবার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব ও অনুরোধ এড়াতে পারেনি, যার জেরে নির্বাচনী প্রচার ছাড়াই কোয়েল রাজ্যসভার সদস্যপদ পান। যদিও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিপর্যয় ও দলের সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এই তারকাদের আর ধর্নামঞ্চ বা সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলিও বুঝতে পারছে যে দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ে গ্ল্যামারের চেয়ে মাঠের পোড়খাওয়া নেতাদের ওপর ভরসা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

