জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক পরিচালক রাজা সেন আর নেই। রবিবার সকালে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রবীণ এই পরিচালকের প্রয়াণে বিনোদন জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চিকিৎসা ও প্রয়াণ: পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে কোমর ও ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে তিনি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তীতে হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যা দেখা দিলে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নন্দনে শেষ শ্রদ্ধা ও শেষকৃত্য: রবিবার দুপুরে পরিচালকের মরদেহ নন্দন চত্বরে আনা হলে তাঁর আত্মীয়, অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, গৌরব চক্রবর্তী, ঋদ্ধিমা ঘোষ, কৌশিক সেন, রেশমি সেন, অঞ্জনা বসু, সুদেষ্ণা রায়সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকে সন্তোষপুরের বাসভবন হয়ে সন্ধ্যায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর মরদেহ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কাঞ্চনা মৈত্র, রাজা দাশগুপ্ত, সোনালি চৌধুরী ও অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা। সন্ধে ৬টা নাগাদ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পরিচালকের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এছাড়া ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পাওলি দাম, ইন্দ্রাণী হালদার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও দেবশঙ্কর হালদারসহ টলিপাড়ার বহু তারকা পরিচালকের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে রাজা সেনের অবদান: একটি তামিল ছবি দিয়ে পরিচালনা সফর শুরু করা রাজা সেন বড় পর্দা, ছোট পর্দা এবং তথ্যচিত্র—তিন মাধ্যমেই নিজের অসামান্য সাক্ষর রেখে গিয়েছেন:
- জাতীয় পুরস্কার ও চলচ্চিত্র: ১৯৯৬ সালে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত তাঁর ছবি ‘দামু’ সেরা শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পায়। পরবর্তীতে ‘আত্মীয়স্বজন’ (১৯৯৮), ‘চক্রব্যূহ’, জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন অভিনীত ‘দেশ’ (২০০২), ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘তিনমূর্তি’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মৌবনে আজ’, ‘খাঁচা’ এবং ‘মায়ামৃদঙ্গ’-র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র উপহার দেন তিনি। তাঁর পরিচালিত শেষ ছবি ‘ভালবাসার গল্প’ মুক্তি পায় ২০১৯ সালে।
- ছোট পর্দা: সাহিত্যভিত্তিক দূরদর্শন ধারাবাহিকে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে ‘সুবর্ণলতা’ ধারাবাহিকটি তাঁকে ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা দেয়। এছাড়া ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দেশ আমার দেশ’ ও ‘গল্পগুচ্ছ’ ধারাবাহিকের সফল পরিচালক ছিলেন তিনি।
- তথ্যচিত্র: ১৯৯৩ সালে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রের জন্য তিনি প্রথম জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং জ্যোতির্ময়ী দেবীর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিদের ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণ করে তিনি সমাদৃত হন।

