দল দখলের জাদু-সংখ্যা প্রায় নাগালে ঋতব্রতদের! আরও নিঃসঙ্গ মমতা, ধর্নামঞ্চে তাঁর পাশে মাত্র ৮ জন বিধায়ক

দল দখলের জাদু-সংখ্যা প্রায় নাগালে ঋতব্রতদের! আরও নিঃসঙ্গ মমতা, ধর্নামঞ্চে তাঁর পাশে মাত্র ৮ জন বিধায়ক

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির দীর্ঘ ২৮ দিন পর প্রথম বার রাজপথে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার ধর্মতলার ওয়াই (Y) চ্যানেলে সংবিধান হাতে নিয়ে বিজেপিকে পরাস্ত করার অঙ্গীকার করলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর প্রত্যাবর্তনের চেয়েও এদিন রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয় হয়ে উঠল তৃণমূলের অন্দরে তীব্র জনপ্রতিনিধি-সংকট ও ভাঙনের জল্পনা।

তৃণমূলের পরিষদীয় দলে তীব্র ফাটলের জল্পনার মধ্যেই এদিনের হাই-প্রোফাইল কর্মসূচিতে তৃণমূলনেত্রীর পাশে দেখা গেল দলের মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন সাংসদকে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে সিংহভাগেরই এই ‘গণ অনুপস্থিতি’ তৃণমূলের রাজনৈতিক ও সংসদীয় অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।

ধর্নাস্থলে ‘জনপ্রতিনিধি শূন্যতা’ ও দলে ভাঙনের জল্পনা

মঙ্গলবার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে আয়োজিত এই ধর্ণা কর্মসূচিতে মমতার পাশে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৮ জন বিধায়ক—শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীমা পাত্র এবং কুণাল ঘোষ। অন্যদিকে, সংসদীয় দলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দুই লোকসভা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মালা রায় এবং চার রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সামিরুল ইসলাম ও নাদিমুল হক।

তৃণমূলের এই ছন্নছাড়া দশা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তারকেশ্বর থেকে তিনি বলেন:

“একটা ছবি দেখলাম, তৃণমূলের এত দুরবস্থা আমি জানতাম না! দেড়শো জন লোকও আসেনি। সাংবাদিকরাই ছিলেন প্রায় দু’শো জনের মতো। শুনলাম মাত্র ৩ জন এমপি আর ৬ জন এমএলএ গিয়েছেন। ওই দলটার অবস্থা এখন ফলতার পুনর্নির্বাচনের মতো হয়ে গিয়েছে।”

এদিকে, সদ্য বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার এক বিস্ফোরক ঘোষণায় জানান, বুধবার হাওড়া গ্রামীণ জেলায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে সেখানকার তৃণমূল বিধায়কেরা উপস্থিত থাকবেন, যা ঘাসফুল শিবিরে নতুন করে আশঙ্কার কাঁপন ধরিয়েছে।

পুলিশের শর্তাধীন অনুমতি ও মমতার চাঁছাছোলা আক্রমণ

গত শনিবার সোনারপুরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট-পরবর্তী হিংসার সেই ঘটনার প্রতিবাদে মূলত রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্ণার ডাক দিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু কলকাতা পুলিশ আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে সেখানে অনুমতি দেয়নি। পরবর্তীতে লালবাজারের শর্তসাপেক্ষ মৌখিক অনুমতিতে ওয়াই চ্যানেলে মঞ্চ না বেঁধে দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালিত হয়।

হ্যান্ড মাইক হাতে ধর্ণামঞ্চ থেকে তৃণমূলনেত্রী সরাসরি রাজ্য প্রশাসন ও বিজেপিকে নিশানা করেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওটা গলির মধ্যে ছিল। হেলমেট না দিলে পাথরটা ওর মাথায় লাগত।” এরপর কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের ‘অসহযোগিতা’ ও সিইও-কে পুলিশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন।

মমতা স্পষ্ট জানান, “যদি বেঁচে থাকি, তবে বিজেপিকে সরিয়েই যাব। আমাদের বিধায়ক-সাংসদদের ভয় দেখাবেন না। পশ্চিমবঙ্গে বুলডোজার রাজনীতি চলছে। ইডি, সিবিআই দিয়ে ভয় দেখিয়ে বিজেপিকে সমর্থন করার কথা বলা হচ্ছে।” পুলিশের উদ্দেশে তাঁর হুঁশিয়ারি, “যাঁরা ধর্ণায় আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার, নবান্ন ও সব থানা ঘেরাও হবে।”

সই-বিতর্ক নিয়ে অবস্থান ও ফরেনসিকের চ্যালেঞ্জ

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবপত্রে সই জালের বিতর্ক নিয়েও মুখ খোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আজ যাঁরা বলছেন সই আমাদের নয়, আমার কাছে তার ভিডিও রেকর্ড আছে। যদি কোনও বিভ্রান্তি থাকে, তবে হাতের লেখার ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে নিন। কিন্তু তার জন্য বিরোধী দলনেতা বাছাই আটকায় না।” স্পিকার নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রাক্তন শাসকদলের যুক্তি, যদি শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা নাই হবেন, তবে স্পিকার তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এলেন কেন এবং স্বাগত ভাষণে বক্তৃতা করতে বললেন কেন?

তৃণমূল ‘চূর্ণ-বিচূর্ণ’, অভিষেকের বিরুদ্ধে সরব ঋতব্রত

মঙ্গলবার সকালে বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী তাপস রায় ফেসবুকে একটি পোস্ট করে দাবি করেন, “তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হলো তৃণমূলের। স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন ঋতব্রত। খেলা হবে।”

যদিও বিধানসভায় ঢোকার মুখে এই সংখ্যাতত্ত্বকে ‘জল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমি আমার এবং সন্দীপন ছাড়া কারও দায়িত্ব নিতে পারব না।” তবে মমতার প্রতি সম্মান বজায় রেখেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কর্পোরেট নীতি’র বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। ঋতব্রত বলেন, “২৬ দিন পরে বেরিয়ে গণপিটুনি খেলেন অভিষেক। মমতা যে পার্টি করেছিলেন, কর্পোরেট নীতিতে চলতে গিয়ে সেই তৃণমূল আজ বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। আমি গদ্দার শুনছি, কিন্তু চোর-চোর শুনছি না।”

একই সঙ্গে উলুবেড়িয়া পুরসভার চেয়ারম্যান অভয় দাসের দুর্নীতি এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পুলক রায়ের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন ঋতব্রত।

বিধানসভায় কুণালের নজিরবিহীন অভিজ্ঞতা

অন্য দিকে, বিধানসভায় স্পিকারের দপ্তরে একটি চিঠি জমা দিতে গিয়ে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও অসীমা পাত্র। কুণালের অভিযোগ, স্পিকারের সচিব তাঁদের স্পষ্ট জানান যে স্পিকারের অনুমতি ছাড়া বিরোধীদের কোনও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না।

ক্ষুব্ধ কুণাল বলেন, “আমরা চিঠিটি স্পিকারের সচিবের টেবিলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রেখে, ভিডিও করে বেরিয়ে এলাম। এটা কি ছেলেখেলা চলছে!” এই বিষয়ে মন্ত্রী তাপস রায়ের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, “যেহেতু আইনি তদন্ত চলছে, তাই হয়তো সচিবালয় চিঠি নেয়নি।”

তারকেশ্বরে শুভেন্দুর প্রশাসনিক রদবদল ও নীল-সাদা রঙ বদলের নির্দেশ

মঙ্গলবার তারকেশ্বর মন্দিরে পুজো দিয়ে জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে তিনি জানান, তারকেশ্বর উন্নয়ন পরিষদে এবার থেকে প্রশাসক নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং তারকেশ্বর ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এডিএম অনুজ প্রতাপ সিংহকে এই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সামনেই শ্রাবণী মেলা। পুণ্যার্থীদের জন্য বড়সড় ব্যবস্থার ঘোষণা করার পাশাপাশি তারকেশ্বর চত্বর থেকে বিদায়ী সরকারের ‘নীল-সাদা’ রঙ মুছে ফেলার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু বলেন, “পবিত্র দুধপুকুর পাড়ে কী সব রঙ করে রেখেছে! আধ্যাত্মিকতা এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই রঙ করা প্রয়োজন। সেই রঙ পরিবর্তনের নির্দেশ আমি আজই মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও প্রধান সচিবকে দেব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.