ক্যানসারের সঠিক চিকিৎসা নিয়ে চিন্তিত? দিশা দেখাচ্ছে শিলিগুড়ির কম্প্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার

ক্যানসারের সঠিক চিকিৎসা নিয়ে চিন্তিত? দিশা দেখাচ্ছে শিলিগুড়ির কম্প্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার

বর্তমান সময়ে ক্যানসার বিশ্বজুড়ে এক অন্যতম প্রধান মারণ ব্যাধি তথা মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। উত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন অঞ্চলের ক্যানসার আক্রান্তদের জন্য এক ছাদের তলায় সার্বিক ও বিশ্বমানের চিকিৎসা পরিষেবা দিতে ২০১৫ সাল থেকে পথ চলা শুরু করেছে শিলিগুড়ির রাঙাপানির ‘মণিপাল কম্প্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার’। সম্প্রতি আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই সেন্টারের অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন হাসপাতালের একঝাঁক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন রেডিয়েশন অনকোলজির সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং অ্যাডভাইজ়র চিকিৎসক স্বপ্নেন্দু বসু, মেডিকেল অনকোলজির চিকিৎসক অর্কপ্রভ হালদার, সার্জিকাল অনকোলজির চিকিৎসক অনির্বাণ নাগ, মাথা ও ঘাড়ের (হেড অ্যান্ড নেক) সার্জিকাল অনকোলজির অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট চিকিৎসক শতদ্রু রায় এবং রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক সৌরভ গুহ ও চিকিৎসক পৃথ্বিজীৎ মৈত্র।

চিকিৎসার নতুন দিগন্ত: ‘বায়োমার্কার ট্রিটমেন্ট’ ও খরচ নিয়ন্ত্রণ

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মণিপাল ক্যানসার সেন্টারে যুক্ত হয়েছে মেডিকেল অনকোলজি, সার্জিকাল অনকোলজি এবং হেড অ্যান্ড নেক অনকোলজির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। ২০২১ সাল থেকে এই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক অর্কপ্রভ হালদার জানান, বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো ‘বায়োমার্কার ট্রিটমেন্ট’। এই পদ্ধতিতে ঢালাও চিকিৎসার পরিবর্তে প্রত্যেক রোগীর শারীরিক প্রয়োজন এবং ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী সম্পূর্ণ আলাদা বা ‘পার্সোনালাইজড’ চিকিৎসা করা হয়।

প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা চিকিৎসার কারণে খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে প্রবীণ চিকিৎসক স্বপ্নেন্দু বসু বলেন,

“আগে সব রোগীর ক্ষেত্রেই কেমোথেরাপির মতো একই ধরনের চিকিৎসা করা হতো। এতে অনেক সময় দেখা যেত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হচ্ছে, কিন্তু আশানুরূপ কাজ হচ্ছে না। এখন আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে চিকিৎসকরা আগে থেকেই বুঝতে পারেন কোন ওষুধটি নির্দিষ্ট কোনও রোগীর শরীরে কাজ করবে আর কোনটি করবে না। সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনই চিকিৎসার নেপথ্যে হওয়া অতিরিক্ত খরচও অনেকটাই সাশ্রয় হয়।”

ক্যানসার সার্জারিতে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘টিউমার বোর্ড’

প্যানক্রিয়াটিক, স্তন, জিভ কিংবা জরায়ুমুখের ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা সার্জারি অত্যন্ত জরুরি একটি প্রক্রিয়া। তবে অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন আমূল পরিবর্তন এসেছে। চিকিৎসক অনির্বাণ নাগ জানান, আগে ক্যানসার শনাক্ত হলেই দ্রুত অস্ত্রোপচার করে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে এখন প্রথমে রেডিয়োথেরাপি বা কেমোথেরাপি দিয়ে টিউমারের আকার ছোট করা হয় এবং তার পর অস্ত্রোপচার করা হয়। এই আধুনিক কৌশলের ফলে চিকিৎসার সাফল্য এবং রোগীর সুস্থতার হার আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে রোগীর জন্য ঠিক কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা এগোবে, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে কোনও চিকিৎসক নেন না। মাথা ও ঘাড়ের সার্জিকাল অনকোলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শতদ্রু রায় জানান, হাসপাতালে একটি বিশেষ ‘টিউমার বোর্ড’ গঠন করা হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন বিভাগের (যেমন সার্জিকাল, মেডিকেল ও রেডিয়েশন অনকোলজি) চিকিৎসকেরা যৌথভাবে বসেন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর নির্ধারণ করেন যে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসাটি আগে করা প্রয়োজন এবং কীভাবে এগোলে রোগী দ্রুত সুস্থ হবেন।

‘ট্রু বিম’ ও ‘হ্যালসিওন’: রেডিয়েশন অনকোলজির বিশ্বমানের প্রযুক্তি

অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি ক্যানসার নিরাময়ে প্রয়োজন অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি। রাঙাপানির মণিপাল ক্যানসার কেয়ার সেন্টারের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক সৌরভ গুহ জানান, নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য এখানে ‘হ্যালসিওন লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর’ (Halcyon Linear Accelerator) এবং ‘ট্রু বিম’ (TrueBeam)-এর মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা ও অত্যাধুনিক দুটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

চিকিৎসক স্বপ্নেন্দু বসু উল্লেখ করেন, এই সেন্টারে প্রতিদিন যে বিপুল সংখ্যক রোগীর সফল চিকিৎসা করা হয়, তা দেশের অনেক বড় হাসপাতালের চেয়েও বেশি। এমনকি বহু বড় বা সরকারি হাসপাতালেও মাত্র একটি বা দুটি যন্ত্রের সাহায্যে এত বিপুল সংখ্যক রোগীকে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব হয় না, যা মণিপাল সেন্টারের উন্নত পরিকাঠামোর কারণে সম্ভব হচ্ছে।

সাধারণের নাগালের বাইরে থাকা ‘ব্র্যাকিথেরাপির’ সুবিধা

এই সেন্টারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নিয়মিত ‘ব্র্যাকিথেরাপি’ (Brachytherapy) করা হয়, যা সব ক্যানসার হাসপাতালে উপলব্ধ থাকে না। এই বিশেষ থেরাপি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে চিকিৎসক পৃথ্বিজীৎ মৈত্র বলেন,

“ব্র্যাকিথেরাপি হলো মূলত একটি অভ্যন্তরীণ রেডিয়েশন প্রক্রিয়া। এতে ক্যানসার আক্রান্ত কোষের ঠিক ভেতরে বা তার খুব কাছাকাছি তেজস্ক্রিয় উৎস রেখে ক্যানসার কোষগুলিকে ধ্বংস করা হয়। মণিপাল সেন্টারে অত্যন্ত আধুনিক ‘আইরিডিয়াম ব্র্যাকিথেরাপি’ এবং ‘ইন্ট্রাক্যাভিটারি ব্র্যাকিথেরাপি’ করা হয়।”

জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে শুরু করে ত্বকের ক্যানসার—বিভিন্ন জটিল ক্যানসারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর।

সব বয়সের রোগীদের একমাত্র ভরসা কেন্দ্র

দুই-আড়াই বছরের শিশু থেকে শুরু করে নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—সব বয়সের ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্যই এই সেন্টারে রয়েছে বিশেষ ও সংবেদনশীল চিকিৎসার সুব্যবস্থা। বিশ্বমানের ‘ট্রু বিম’ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং একই ছাদের তলায় অনকোলজির সমস্ত বিভাগের সমন্বয়ের কারণে ‘মণিপাল কম্প্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার’ আজ উত্তরবঙ্গ তথা সংলগ্ন এলাকার মানুষের কাছে ক্যানসার চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এই চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.