কমনওয়েলথ গেমসে রুপো জয়: অভাব ও শৈশবের কঠিন লড়াইকে হারিয়ে শীর্ষে ভারোত্তোলক ঋষিকান্ত

কমনওয়েলথ গেমসে রুপো জয়: অভাব ও শৈশবের কঠিন লড়াইকে হারিয়ে শীর্ষে ভারোত্তোলক ঋষিকান্ত

কমনওয়েলথ গেমসের গেমস ভিলেজে গত রবিবার রাতে এক অনন্য মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন ভারতের খেলোয়াড় ও শিক্ষকেরা। পুরুষদের ৬০ কিলোগ্রাম বিভাগে ভারোত্তোলনে রুপো জয়ের পর নৈশভোজে যোগ দিতে এসে সহখেলোয়াড় ও কোচেদের উষ্ণ অভিনন্দনে আবেগে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি মণিপুরের অ্যাথলিট ঋষিকান্ত সিংহ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশবাসীকে গর্বিত করা এই অ্যাথলিটের শৈশব ও সফলতার পিছনের ইতিহাস অত্যন্ত সংগ্রামমুখর।

ধাবার এঁটো বাসন থেকে জাতীয় মর্যাদা: এক নজিরবিহীন লড়াই

ইম্ফলের কাছে এক প্রত্যন্ত গ্রামে বড় হওয়া ঋষিকান্তের সংগ্রাম শুরু মাত্র ১১ বছর বয়সে। পরিবারের তীব্র আর্থিক অনটনের দিনে বাবার ট্যাক্সি চালানোর আয়ে ঠিকমতো দু’বেলার খাবার জুটত না। মা চন্দ্রজিনী দেবী চানাম্বাম প্রায়শই শুধু ভাত বা আটার গুলি খেয়ে দিন কাটাতেন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কিশোর ঋষিকান্ত রাস্তার একটি ধাবায় দিনে মাত্র ১৫০ টাকা মজুরিতে এঁটো বাসন মেজেছেন এবং সন্ধের পর নির্মাণাধীন বাড়ির ট্যাঙ্কে জল ভরার কাজ করেছেন।

বর্তমানে ভারতীয় নৌসেনার কর্মী ঋষিকান্ত সর্বভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমকে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন:

“পকেটে রুপোর পদক নিয়ে খাবার খেতে এসে অতীত আর ধাবার রান্নার কর্মীদের দেখে নিজের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমার এই পদক সেই সব মানুষের জন্য, যাঁরা কখনও কোনও সাহায্য পাননি এবং ছোট থেকেই পরিবারের বোঝা টানছেন।”

যেভাবে ভারোত্তোলনে আগমন

১২ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় একটি মেলায় এক ক্রীড়াশিক্ষকের নজরে পড়েন ছিপছিপে চেহারার ঋষিকান্ত। তাঁর পরামর্শে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (SAI) ট্রায়ালে যোগ দেন তিনি। তৎকালীন প্রধান কোচ এবং বর্তমান মণিপুর ভারোত্তোলন সংস্থার সচিব ব্রজেন্দ্র সিংহ তাঁকে ভারোত্তোলনের জন্য বেছে নেন।

ব্রজেন্দ্র সিংহের কথায়, “রোগা হলেও ওর পেশী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মানসিক জোর ছিল প্রবল।” তবে ঋষিকান্ত জানান, তিনি খেলোয়াড় হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রশিক্ষণের জায়গায় বিনামূল্যে খাবারের সংস্থান হবে বলেই প্রথমে এই খেলায় যোগ দিয়েছিলেন।

হতাশা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

১৮ বছর বয়সে পরিবারের উৎসাহের অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে চরম হতাশায় খেলা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান ঋষিকান্ত। কিন্তু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় মণিপুর ভারোত্তোলন সংস্থার তৎকালীন সচিব সুনীল এলাংবামের একটি ফোনে। সুনীলের পরামর্শে সদ্য চালু হওয়া ‘ওয়েটলিফটিং সেন্টার ফর এক্সেলেন্স’-এ ট্রায়াল দিয়ে নির্বাচিত হন ঋষিকান্ত।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি:

  • ২০১৯: ৫৫ কেজি বিভাগে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক লাভ।
  • ২০১৯: কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয়।
  • পরবর্তী সাফল্য: ক্রীড়া কোটায় ভারতীয় নৌসেনায় স্থায়ী চাকরি লাভ এবং পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূরীকরণ।

অতীতকে ভুলে যাননি ঋষিকান্ত

আন্তর্জাতিক সাফল্যের পর প্রথম কাকে খবরটা দিয়েছেন? প্রশ্নে ঋষিকান্ত জানান, শৈশবে ধাবায় কাজ করার সময়কার সহকর্মী ও বন্ধুকে তিনি প্রথম ফোন করে রুপো জয়ের কথা জানান।

বর্তমানে নিজের কঠোর পরিশ্রমের ফল উদযাপনের পাশাপাশি দুস্থ অ্যাথলিটদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন ঋষিকান্ত। কমনওয়েলথ গেমসের এই ঐতিহাসিক পদকটি তিনি তুলে দিতে চান তাঁর মা-বাবা ও ভাই-বোনদের হাতে, যাঁরা বিগত আট বছর ধরে তাঁর স্বপ্নের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.