নিট আন্দোলন ও ধর্মতলায় অশান্তি: দিনভর টানাপড়েন শেষে জামিন ধৃত ১৬ জনের, মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু লালবাজারে

নিট আন্দোলন ও ধর্মতলায় অশান্তি: দিনভর টানাপড়েন শেষে জামিন ধৃত ১৬ জনের, মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু লালবাজারে

নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কলকাতায় আয়োজিত মিছিলে গোলমালের জেরে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জন আন্দোলনকারীই জামিন পেলেন। মঙ্গলবার মুখ্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) আদালত ৫০০ টাকার বন্ডে প্রত্যেকের জামিন মঞ্জুর করে। একইসঙ্গে পুলিশের তরফে দায়ের করা মূল মামলাটি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে লালবাজার সূত্রের খবর।

দিনভর টানাপড়েন ও আদালতের রায়ে রদবদল

মঙ্গলবার দুপুরে হেয়ার স্ট্রিট থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় (এফআইআর নম্বর ১৫২/২৬) ধৃত ১৬ জনকে আদালতে পেশ করা হলে জামিনের আবেদন জানান তাঁদের আইনজীবীরা। তবে সরকারি আইনজীবী সেই আবেদনের বিরোধিতা করে জেল হেফাজতের আর্জি জানালে বিচারক অভিযুক্তদের ৩০ জুলাই পর্যন্ত জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের নথি হাতে পেয়ে পুনরায় শুনানির আর্জি জানান অভিযুক্তদের আইনজীবী ইয়াসিন রহমান, রাজা সেন ও প্রশান্ত বাগচীরা। বিচারক সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী ধৃতদের কারও অতীতের অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে কি না, তা নিয়ে আদালত জানতে চাইলে তদন্তকারী আধিকারিক জানান, ৫ জনের বিরুদ্ধে অতীতে অভিযোগ ছিল। তবে তাঁরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন কি না— আইনজীবীদের এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না মেলায় বিচারক ১৬ জনেরই জামিন মঞ্জুর করেন। রায়ে স্পষ্ট জানানো হয়, কারও বিরুদ্ধেই অতীত অপরাধের প্রমাণ মেলেনি। জামিনে মুক্তির পর ধৃতদের ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট

দিল্লির যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে নিট প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল বিহার, অসম, মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যে। গত শুক্রবার কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল কেন্দ্র করে গোলমাল বাঁধে। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই ঘটনায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি এবং নিগৃহীতদের অভিযোগে সাতটি— মোট আটটি এফআইআর রুজু করে।

ইতিপূর্বে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মন্তব্য করেছিলেন যে, মিছিলে ইচ্ছাকৃতভাবে অশান্তি পাকানো হয়েছে এবং চিহ্নিত ৭০ জন ব্যক্তি ছাত্র বা ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র সদস্য নন। জলপাইগুড়ির এক কর্মসূচিতেও তিনি বহিরাগতদের দিকে ইঙ্গিত করেন।

কেন্দ্র-সিজেপি সমঝোতা ও রাজ্যগুলির পদক্ষেপ

বিতর্কের আবহে গত শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দেন। পরবর্তীতে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি জেপি নড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংহের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়— আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং নিট বিপর্যয়ে প্রাণ হারানো পড়ুয়াদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। কেন্দ্র শর্ত মেনে নিলে দেশজুড়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করে সিজেপি।

তবে সোমবারেও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় পুনরায় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন সিজেপি নেতা সৌরভ দাস। এরপরই কেন্দ্র থেকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিকে মামলা তোলার আশ্বাস দেওয়া হয়, যার প্রেক্ষিতে বিহার ও অসম সরকার ইতিমধ্যেই বিজ্ঞপ্তি জারি করে মামলা প্রত্যাহার করেছে। মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চও নির্দেশ দেয় যে, অপরাধের ইতিহাস না থাকা এবং গ্রেফতার হওয়া সব নাবালকদের মুক্তি দিতে হবে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী আইনি অবস্থা

আদালতের এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বিজেপি মুখপাত্র বিমলশঙ্কর নন্দ জানান, আদালতের রায় মেনেই সরকারকে এগোতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে। অন্যদিকে, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সরকারের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, রাজ্য সরকারকে আইনি ও প্রশাসনিক ধাক্কা খেতে হয়েছে।

লালবাজার সূত্রের খবর, পুলিশের রুজু করা মামলাটি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও নিগৃহীতদের দায়ের করা বাকি সাতটি মামলায় তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.