আনকোরা ‘আরশোলা’ আর পোড়খাওয়া ওয়াংচুকের সঙ্গে জেন জ়ি-ভিড়, কিসের সঙ্কেত পেয়ে পিছু হটল মোদী সরকার

আনকোরা ‘আরশোলা’ আর পোড়খাওয়া ওয়াংচুকের সঙ্গে জেন জ়ি-ভিড়, কিসের সঙ্কেত পেয়ে পিছু হটল মোদী সরকার

দেশের ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট)-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে অবশেষে ইস্তফা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার সকালে নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এই পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন তিনি। পরে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম আন্দোলনের চাপে নতিস্বীকার করে মন্ত্রিসভার কোনও সদস্যকে পদত্যাগ করতে হলো। এর আগে ২০২০ সালে তীব্র কৃষক আন্দোলনের চাপে বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছিল কেন্দ্র।

জেন জি ও সিজেপি-র আন্দোলন

সম্প্রতি নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদে নামেন পড়ুয়া ও যুবসমাজ। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ব্যানার তলে আয়োজিত এই আন্দোলনে মূল চালিকাশক্তি ছিল জেন জি ও মিলেনিয়ালরা। নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে টানা বিক্ষোভের পাশাপাশি শিক্ষাকর্মী ও সমাজসৈনিক সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিন অনশন পালন করেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তিনি অনশন ভঙ্গ করলেও সিজেপি শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় থাকে।

সরকারের তরফ থেকে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র ৪৭ জন আধিকারিককে সরানো, শিক্ষাসচিবের বদলি এবং প্রশ্ন ফাঁসে যুক্তদের ১০ বছরের জেল ও ১০ কোটি টাকা জরিমানার বিল আনা হলেও আন্দোলনকারীরা আন্দোলন থেকে সরেননি। শনিবার সরকারের সঙ্গে তৃতীয় দফার বৈঠকের আগে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা ছাড়া কোনও আলোচনা সম্ভব নয়। এর পরেই নাটকীয়ভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

ইস্তফা ও প্রতিক্রিয়া

নিজের পদত্যাগ প্রসঙ্গে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, দেশের যুবশক্তির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে এবং পরিস্থিতি যাতে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি ব্যবহার করতে না পারে, তাই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণার পর সরকারের সঙ্গে সিজেপি-র প্রতিনিধিদের বৈঠক সফল হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং এবং সিজেপি-র মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার উপস্থিতিতে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে জানানো হয় যে, আন্দোলনকারীদের অধিকাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং আন্দোলন প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

  • বিরোধী শিবিরের প্রতিক্রিয়া: কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী যুবসমাজের এই জয়কে অভিনন্দন জানিয়ে একে শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র আন্দোলনরত যুবসমাজকে ভূয়সী প্রশংসা করেন।
  • শাসক দলের প্রতিক্রিয়া: বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই সিদ্ধান্তকে নিঃস্বার্থ সেবার সর্বোচ্চ মান বলে উল্লেখ করেছেন। তবে হিমাচল প্রদেশের রাজ্যপাল কবিন্দর গুপ্ত এই আন্দোলনের পেছনে অন্য কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি অনুঘটক মাত্র। এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন স্নাতকদের মধ্যে অতি নগণ্য অংশ স্থায়ী কাজ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি যুবসমাজের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও, গভীর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সংস্কার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সরকারের চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কাটছে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.